‘এক মাসে ৬৭০ দুর্ঘটনা, প্রাণ হারালেন ৬৮২ জন’
সদ্যগত মার্চে সড়কে মোট ৬১৬টি দুর্ঘটনায় ৬১৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫৪৮ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, সড়ক, রেল ও নৌ-পথ মিলিয়ে মোট ৬৭০টি দুর্ঘটনায় ৬৮২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১,৭৯৬ জন আহত হয়েছেন। এ সময় সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।
শনিবার (৪ এপ্রিল) সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশিত দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, মার্চে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে—১৬০টি দুর্ঘটনায় ১৭০ জন নিহত এবং ৩২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা হয়েছে—৩০টি দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত এবং ১২২ জন আহত হয়েছেন।
সড়কে হতাহতদের মধ্যে রয়েছে ৯ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১৫৭ জন চালক, ৯০ জন পথচারী, ১৭ জন পরিবহন শ্রমিক, ৬৮ জন শিক্ষার্থী, ১৫ জন শিক্ষক, ৭৮ জন নারী, ৮৬ শিশু, ৪ জন সাংবাদিক, ৩ জন চিকিৎসক, ১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ জন আইনজীবী, ৩ জন প্রকৌশলী এবং ১৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৫ জন পুলিশ সদস্য, ১ জন আনসার সদস্য, ১ জন বিজিবি সদস্য এবং ১ জন ফায়ার সার্ভিস সদস্য। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্চে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪০.৯০% জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.০৩% আঞ্চলিক মহাসড়কে, এবং ২২.০৭% ফিডার রোডে ঘটেছে। এছাড়া ৫.৫১% দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে, ০.৪৮% চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ০.৯৭% রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে, মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ:
১. দেশের সড়ক ও মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা অবাধে চলাচল।
২. জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকা; রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ বাস উঠে আসা।
৩. সড়কে মিডিয়ামে রোড ডিভাইডার না থাকা এবং অন্ধবাঁক গাছপালায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি।
৪. মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের নানাবিধ ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।
৫. উল্টোপথে যানবাহন চলানো, সড়কে চাদাঁবাজি এবং পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন।
৬. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অতিরিক্ত যাত্রীবহন।
৭. বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং একজন চালক অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানো।
৮. ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের কারণে বাসের ছাদে, খোলা ট্রাক ও পিকআপে, ট্রেনের ছাদে এবং বাসের ইঞ্জিন বনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসাধারণের যাতায়াত।
দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সুপারিশসমূহ:
১. সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতি চালু করা।
২. মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করা।
৩. জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা।
৪. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং যানবাহনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান করা।
৫. বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের সরকার ঘোষিত ৬০ ঘণ্টার ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা।
৬. পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।
৭. গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা রাখা।
৮. সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা এবং চালকদের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা।
৯. মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন করা।
১০. উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
১১. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা।
১২. সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালু করা।
১৩. ঈদযাত্রা এবং ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা চাপ কমানোর লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: