• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬

“নদীর বুকে নিঃসঙ্গ জীবন”

কালির আলগা চরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, উন্নয়নের ছোঁয়া অধরা

শফিকুল ইসলাম বেবু, কুড়িগ্রাম 

প্রকাশিত: ১২:৩৭, ৮ এপ্রিল ২০২৬

ফন্ট সাইজ
কালির আলগা চরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, উন্নয়নের ছোঁয়া অধরা

ব্রহ্মপুত্রের বুকে ভেসে থাকা এক টুকরো ভূমি—নাম তার কালির আলগা। কাগজে-কলমে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড হলেও বাস্তবে এটি যেন রাষ্ট্রের প্রান্তিকতারও বাইরে এক নিঃসঙ্গ জনপদ। যেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে, কিন্তু মানুষের কষ্ট বুঝতে লাগে না এক মুহূর্তও।

কুড়িগ্রাম শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব—শুনতে খুব বেশি নয়। কিন্তু সেই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বোঝা যায়, দূরত্ব শুধু মাইলের নয়, উন্নয়ন আর বঞ্চনারও।

যাত্রাপুর ঘাটে পৌঁছে কিছুটা পথ পায়ে হাঁটা, তারপর ঘোড়ার গাড়িতে প্রায় এক কিলোমিটার। এরপর ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে নৌকার দীর্ঘ এক ঘণ্টার যাত্রা—এই কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়েই পৌঁছাতে হয় কালির আলগা চরে। যাত্রাপথেই চোখে পড়ে নদীর ভাঙন, দিগন্তজোড়া বালুচর আর মানুষের অনিশ্চিত জীবনের গল্প।

“সময় মিস মানেই ঘরে ফেরা বন্ধ”
চরের মানুষের জীবন যেন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে বাঁধা। সকাল ১০টার নৌকা মিস করলে শহরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিকাল ৪টার নৌকা ধরতে না পারলে সেদিন আর ঘরে ফেরা সম্ভব নয়।

চরের বাসিন্দা জামাল উদ্দিনের কণ্ঠে হতাশা— “আমাদের জীবনটা নৌকার সময়ের ওপর চলে। সময় মিস করলে আমরা যেন বন্দি হয়ে যাই এই চরে।”

অসুস্থতা মানেই আতঙ্ক
কালির আলগা চরে নেই কোনো হাসপাতাল, নেই একটি কমিউনিটি ক্লিনিকও। রাতের অন্ধকারে কেউ অসুস্থ হলে চারদিকে নেমে আসে অসহায়ত্বের গভীর ছায়া।

গৃহবধূ আনোয়ারা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “রাতে কেউ অসুস্থ হলে আল্লাহ ছাড়া ভরসা নাই। নৌকা নাই, রাস্তা নাই—মানুষের জীবনও তখন থমকে যায়।”

স্থানীয়রা জানান, অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। তাই তাদের দীর্ঘদিনের দাবি—একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স।

শিক্ষাহীন প্রজন্ম, বাড়ছে বাল্যবিবাহ
চরে নেই কোনো স্কুল। শিশুরা বইয়ের বদলে দেখে নদীর ভাঙন, শেখে টিকে থাকার লড়াই।

স্থানীয় যুবক সোহেল মিয়া বলেন, “স্কুল না থাকায় ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে পারে না। মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য অনেকেই কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়।” এই চরে শিক্ষা যেন স্বপ্ন, আর বাল্যবিবাহ বাস্তবতা।

প্রাণিসম্পদ আর কৃষিতেই বেঁচে থাকা
চরের প্রতিটি বাড়ি যেন ছোটখাটো খামার। গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি—এসবই তাদের সম্পদ, তাদের ভবিষ্যৎ।

স্থানীয়দের মতে, চরে প্রায় ৪ হাজার গরু, ৫ হাজার ভেড়া ও ৫ হাজার ছাগল রয়েছে। পাশাপাশি ধান, কাউন, তিল, চিনাবাদাম, ডালসহ শতাধিক ফসল উৎপাদন করেন তারা।

কৃষক আখতার হোসেন বলেন, “মাটি আমাদের সব দেয়, কিন্তু বাজারে নিতে গিয়ে আমরা হেরে যাই।”

বাজার নেই, কষ্ট আছে
উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে যেতে হয় যাত্রাপুর হাটে। নৌকায় পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে খরচ ও ঝুঁকি—দুটোই বাড়ে।

আল্লাদি খাতুন বলেন, “চরে যদি একটা হাট থাকত, তাহলে আমরা এত কষ্ট করে পণ্য নিয়ে যেতাম না।”

বন্যা এলে ভেসে যায় স্বপ্ন
প্রতিবছর বন্যা আর নদীভাঙন এই চরের মানুষকে নতুন করে নিঃস্ব করে। বসতভিটা হারিয়ে তারা আবার নতুন চরে ঘর বাঁধে—এক অনন্ত চক্রের মতো।

কৃষক সফিকুল ইসলাম প্রামানিক এর কণ্ঠে হাহাকার— “বন্যা এলে গরু-ছাগল রাখার জায়গা পাই না। তাই কম দামে বিক্রি করে দিতে হয়।”

চরে কোনো উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় গবাদিপশু রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

নতুন জমি, নতুন আশার আলো
সম্প্রতি কালির আলগা চরে প্রায় ১০০ একর নতুন জমি জেগে উঠেছে। কিন্তু সেই জমির সুষ্ঠু বণ্টন নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

স্থানীয়রা চান— এই জমি যেন প্রকৃত চরের মানুষের মাঝে ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হয়।

“আমরা কি এই দেশের মানুষ না?”
চরের প্রবীণ বাসিন্দা কলিমুদ্দির প্রশ্ন— “আমরা কি এই দেশের মানুষ না? আমাদের জন্য স্কুল নাই, হাসপাতাল নাই, রাস্তা নাই। আমরা কি উন্নয়নের বাইরে?”

এই একটি প্রশ্নই যেন কালির আলগা চরের হাজারো মানুষের না বলা কষ্টের প্রতিধ্বনি।

দাবিগুলো স্পষ্ট, অপেক্ষা শুধু বাস্তবায়নের

চরবাসীর দাবি— একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, চরের মধ্যে একটি স্থায়ী বাজার, বন্যার সময় গবাদিপশুর জন্য উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র ও  নতুন জমির সুষ্ঠু বণ্টন।

শেষ দৃশ্য
সূর্য যখন ব্রহ্মপুত্রের বুকে ঢলে পড়ে, কালির আলগা চর তখন ডুবে যায় লালচে আলোয়। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে বঞ্চনার দীর্ঘ ছায়া।

এ যেন এক এমন জনপদ—যেখানে মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো এখনো পৌঁছায়নি। কালির আলগা চরের মানুষগুলো আজও অপেক্ষায়—কবে তাদের জীবনেও উন্নয়নের নৌকা ভিড়বে।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: