জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত মহাপরিকল্পনার আহ্বান জিয়াউদ্দিন হায়দারের
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি ও কৃষিসংকটের পাশাপাশি বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির ঝুঁকি। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক, বহুখাতভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজশাহীর ইউরিচ (YOUREACH) সিটি কনভেনশন হলে ‘হাই-লেভেল পলিসি ডায়ালগ: টার্নিং ক্লাইমেট ভিকটিমস ইনটু ক্লাইমেট জাস্টিস—সেভ দ্য বারিন্দ ট্র্যাক্ট’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের নীতি সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য হাবিবা মাহমুদা, সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এবং সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, গবেষক, বিশেষজ্ঞ, উন্নয়নকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা সংলাপে অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও মানবাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বহুমাত্রিক সংকট।
তিনি বলেন, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া, নদী-খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাধারের সংকট, মাটির আর্দ্রতা হ্রাস এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং ফসলহানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে দরিদ্র কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে গ্রামীণ দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ঝুঁকি।
জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে ড. হায়দার বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের জলবায়ু সংকটকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানির সংকটে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা কমে যায়, ব্যাহত হয় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বাস্থ্যবিধি। অন্যদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ কৃষক, কৃষিশ্রমিক, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
তিনি আরও বলেন, কৃষি উৎপাদন ও পারিবারিক আয় কমে গেলে দরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য হ্রাস পায়। এতে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের অপুষ্টি এবং শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও শিশু পুষ্টিসেবা, তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং কমিউনিটিভিত্তিক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ড. হায়দার বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার বিষয়ে নীতিগত অঙ্গীকার করেছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পানিসংকট নিরসনে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্য ভূমিকা, নদী-খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং পৃষ্ঠস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার সমন্বিতভাবে বিবেচনার পরামর্শ দেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতার ধরনে পরিবর্তন আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর প্রভাব বিভিন্ন সংক্রামক ও বাহকবাহিত রোগের ঝুঁকিতেও পড়তে পারে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের কমিউনিটিভিত্তিক ডেঙ্গু প্রতিরোধ উদ্যোগে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সংলাপে বরেন্দ্র অঞ্চলের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ছয়টি অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন ড. হায়দার। এগুলো হলো—বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষ জলবায়ু অভিযোজন নীতিমালা প্রণয়ন, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও কৃষক সুরক্ষা, নারী-শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা, গবেষণা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার এবং জলবায়ু অর্থায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের ভৌগোলিক, মৃত্তিকা, কৃষি, পানিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পৃথক আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, নদী-খাল-বিল-পুকুর পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া খরাসহিষ্ণু ও কম পানিনির্ভর ফসলের আবাদ, আধুনিক সেচপ্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষকদের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা এবং ফসলহানির ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষিবিমার সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেন তিনি। খরা, তাপপ্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি পর্যবেক্ষণে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলারও পরামর্শ দেন।
জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায্য অর্থায়ন, নিরাপদ পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ড. হায়দার। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণে স্থানীয় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন তিনি। ড. হায়দার বলেন, প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, ক্ষয়ক্ষতি এবং ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়নের দাবি তুলে ধরেছেন। একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে বরেন্দ্রের মতো বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য কার্যকর অভিযোজন কর্মসূচি গ্রহণও জরুরি।
নীতি সংলাপের আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এ আয়োজন যেন কেবল আলোচনা ও সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এখান থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য, অর্থায়নযোগ্য ও ফলাফলভিত্তিক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: