• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪

Inhouse Drama Promotion
Inhouse Drama Promotion

লামায় বন উজাড় করছেন নেতার ভাই, হাতি দিয়ে পাচারের অভিযোগ

ডয়চে ভেলে

প্রকাশিত: ১৩:১৫, ৫ মে ২০২৩

আপডেট: ১৩:২০, ৫ মে ২০২৩

ফন্ট সাইজ
লামায় বন উজাড় করছেন নেতার ভাই, হাতি দিয়ে পাচারের অভিযোগ

পাহাড় থেকে হাতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় গাছের গুড়ি

বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের ম্রো সম্প্রদায়ের পুরো একটা পাড়াকে জিম্মি করে প্রাকৃতিক বন উজাড় করা হচ্ছে৷ অভিযোগের আঙুল এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাইয়ের দিকে৷ চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার মোরশেদ আলম চৌধুরী প্রায় দুই দশক ধরে এই বন থেকে গাছ কেটে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ৷ কেউ বাধা দিতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়৷ অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়৷ 

 

পাহাড় থেকে হাতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় গাছের গুড়ি৷ হাতির বিষ্ঠায় ছড়াগুলোর পানি দূষিত হয়ে যায়৷ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েন স্থানীয় ম্রো-রা৷ দূষিত জল খেয়ে কয়েকজন স্কুল ছাত্রের ইতিমধ্যে ডায়রিয়া হয়েছে৷

বান্দরবন জেলা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে সুয়ালক-লামা সড়কের পাশে সরই ইউনিয়ন৷ সরইয়ের কেয়াজু বাজার থেকে ১২ কিলোমিটার পূর্বে এই লেমুপালং মৌজার অবস্থান৷ সরই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়েছে এটি৷ সম্প্রতি ওই এলাকা ঘুরে স্থানীয় সাংবাদিক উসিথোয়াই মারমা৷ বাংলাভিশনের কন্টেন্ট পার্টনার ডয়চে ভেলে্কে তিনি বলেন, "আমি লামা ঘুরতে গিয়েছিলাম৷ যখন ফিরে আসি, তখন স্থানীয় কয়েকজন যুবক আমাকে বলেন, হতির বিষ্ঠায় খাওয়ার পানির ছড়াগুলো দূষিত হচ্ছে৷ ৪ জন শিক্ষার্থী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে৷ এটা যেন আমি প্রশাসনের দৃষ্টিতে আনি৷ সেই সূত্র ধরেই আমি সেখানে গিয়ে অবৈধভাবে বন উজাড় করার তথ্য পেয়েছি৷ আমার সঙ্গে যখন ম্রো সম্প্রদায়ের লোকজন কথা বলছিলেন, তখন তাদের চোখে-মুখে ভয় আর আতঙ্কের ছাপ দেখেছি৷ তারা বলেছেন, এ নিয়ে রিপোর্ট হলে তাদের উপর নির্যাতন হতে পারে৷ তবে ঈদের ছুটি শেষ না হওয়ায় আমি সেখানে গিয়ে শ্রমিকদের কাউকে পাইনি৷ শুধু একজন মাহুতের সহকারীকে পেয়েছি৷ হাতিটিও আমি দেখেছি৷ পানি দূষিত হওয়ার বিষয়টিও আমি দেখেছি৷”

দুই দশক ধরে এই বন থেকে গাছ কাটার ফলে প্রায় বৃক্ষশুণ্য হয়ে পরেছে

সেখানে অবৈধভাবে বন উজাড় করার তথ্য পেয়েছি: উসিথোয়াই মারমা

সরই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মেন ওয়াই ম্রো বলেন, "দুই দশকের বেশি সময় ধরে এখান থেকে গাছ কেটে নিচ্ছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার মোরশেদ আলম চৌধুরী৷ ২০১৫ সালে আমরা কয়েকজন তাদের এই কাজে বাধা দিয়েছিলাম৷ গাছ কাটায় বাধা দেওয়ার পর আমাদের তিন জনের বিরুদ্ধে অপহরণ, হত্যাচেষ্টা ও মাদকের তিনটি মামলা দেওয়া হয়৷ ফলে এরপর আর কেউ বাধা দেওয়ার সাহস করেনি৷ পাঁচ বছর মামলা চালানোর পর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২০২০ সালে মামলা খারিজ হয়ে যায়৷ আসলে আমাদের এলাকার অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর ও জুমচাষি৷ কোথাও অভিযোগ করলে হয়রানি ও মামলার ভয়ে কেউ কিছু বলেন না৷ কোথাও অভিযোগ দিয়েছি শুনলে আমাদের উপর চাপ বাড়ে৷”

মোরশেদ আলম চৌধুরী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগের কমিটির সদস্য৷ বর্তমানে তিনি ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে আছেন৷ তার বড় ভাই লোহাগড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, "আমার ভাই দীর্ঘদিন ধরে কাঠের ব্যবসা করেন৷ যে জায়গা থেকে গাছ কাটার কথা বলা হচ্ছে, তার পাশে আর্মি ক্যাম্প, পুলিশ ক্যাম্প আছে৷ অনুমতি না থাকলে কি তিনি ওখান থেকে গাছ কেটে আনতে পারবেন? আমি বিষয়গুলো পুরোপুরি জানি না৷ তিনি দেশে এলেই বিষয়টি জানা যাবে৷ তবে আমি যতটুকু জানি, বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই তিনি এতদিন ধরে কাঠের ব্যবসা করে আসছেন৷”

লোহাগড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী

তবে এমন অনুমতির কথা অস্বীকার করেছেন লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরিফুল হক বেলাল৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, "আমার জানা মতে, এমন কোনো অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি৷ পাশাপাশি হাতি ব্যবহার করে কাঠ টানতে হলেও বন বিভাগের অনুমতি লাগে৷ সেই অনুমতিও আমরা দিইনি৷ বিষয়টি জানার পর আমি একটি তদন্ত কমিটি করেছি৷ নিরাপত্তার কারণে তারা এখনো ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারেনি৷ তবে দু-এক দিনের মধ্যেই তারা সেখানে যাবেন৷ বিষয়টি দেখে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো৷”

সার্ক মানবাধিকার ফোরামের সহ-সভাপতি অং ম চং বলেন, "সংরক্ষিত এই বনম্রো সম্প্রদায়ের জীবন ধারণের মাধ্যম৷ এখন তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন যদি অবৈধভাবে কেটে নেওয়া হয়, তাহলে কি হবে? আমি চাই প্রশাসন দ্রুত এ ব্যাপারে পদেক্ষপ নিক৷ তিনি যত বড় নেতাই হোন না কেন, দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই৷”


বান্দরবান লামার অলকপাড়া, সুয়ালক ইউনিয়নের ক্রামাদিপাড়া, ম্রলংপাড়া, সরই ইউনিয়নের বেশিরভাগ পাড়াতেই পাড়াবন উজাড় করা হচ্ছে। 
জানা গেছে, লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের লেমুপালং মৌজায় ১৩টি ম্রো পাড়া রয়েছে৷ বান্দরবান হেডম্যান-কারবারি কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বেতছড়া মৌজার হেডম্যান হা থোয়াই হৃ মারমা বলেন, "আমাদের এখানে পাড়াবন বা গাছ বিক্রির কোনো বিধি-বিধান নেই৷ প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, হেডম্যান মৌজারবনের সম্পদ ও ভূমি সংরক্ষণ করেন৷ কোনো হেডম্যান চাইলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মৌজার বন বিক্রি করে দিতে পারেন না৷ প্রথাগত বিধিতে এটা কোথাও নেই৷ কেউ যদি না জেনে করে থাকেন তা-ও সম্পূর্ণ অবৈধ৷”

যত বড় নেতাই হোন ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই: অং ম চং


মোরশেদ আলম চৌধুরীর লোকজনের দাবি- জোত-পারমিটের মাধ্যমে মৌজাপ্রধান হেডম্যানের কাছ থেকে ওই বাগান কেনা হয়েছে এবং বৈধভাবেই গাছ কাটা এবং হাতি দিয়ে সেই গাছ-কাটা কাঠ টানা হচ্ছে৷ একসময় লেমুপালং মৌজার হেডম্যান ছিলেন চন্দু ম্রো৷ তিনি নিরক্ষর ছিলেন৷ বলা হচ্ছে, তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে সারা জীবনের জন্য এই চুক্তিপত্র তৈরি করা হয়েছে৷ 

 এই মৌজার হেডম্যান চন্দু ম্রোর ছেলে কাইন ওয়াই ম্রো ডয়চে ভেলেকে বলেন, "বনের গাছ না কাটার জন্য মোরশেদের লোকজনকে নিষেধ করা হলেও তারা আমার বাবার সঙ্গে একটা চুক্তির কথা বলে৷ কিন্তু কী চুক্তি, কত বছরের চুক্তি আমি বা আমরা কিছুই জানি না৷ আমরা অনেকবার তাদের নিষেধ করেছি৷ কিন্তু তারা আমাদের কথা শোনেন না৷”

পুরাতন দেওয়ান পাড়া, নতুন দেওয়ান পাড়া এবং বাক্কা পাড়ার মাঝখানে একটি স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে৷ এই স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ঝিরি৷ এদিকে এই কাঠ বহনের জন্য আনা হয়েছে হাতি৷ সেই হাতির বিষ্ঠায় ঝিরির পানি দূষিত হয়ে গেছে৷ স্কুলের শিক্ষার্থী ও আশপাশের পাহাড়িদের খাওয়ার পানির উৎস এই ঝিরি৷ দুই সপ্তাহ আগে গরমের মধ্যে চার শিক্ষার্থী সেই ঝিরির পানি পান করে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে৷

স্কুলের শিক্ষক থোংয়া ম্রো বলেন, "আমাদের স্কুলটি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত৷ ফলে ছোট বাচ্চারা এখানে আসে৷ আমরা দেখি, ঝিরি দিয়ে হাতির পিঠে করে কাঠ নেওয়া হয়৷ আমরা বাচ্চাদের নিষেধ করেছি ঝিরির পানি খেতে৷” যারা হাতি দিয়ে কাঠ নিচ্ছে তাদের কি এই ঝিরি দিয়ে না নেওয়ার কথা বলেছেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "তারা ক্ষমতাশালী লোক৷ তাদের এসব বলে আমরা আবার কী বিপদে পড়ি, তাই কিছু বলিনি৷”

লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তফা জাবেদ কায়সা বলেন, "গাছ কাটা ও ঝিরির পানি দূষিত হওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি৷ এ নিয়ে বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে৷ তাদের একটি রিপোর্ট দিতে বলেছি৷ তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷”

মন্তব্য করুন:

Drama Branding Details R2
Drama Branding Details R2