• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

Inhouse Drama Promotion
Inhouse Drama Promotion

রোহিঙ্গা নিয়ে আনলিমিটেড তামাশা

এস এম তানবীর আলম সিদ্দিকী

প্রকাশিত: ১৮:১৫, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩

ফন্ট সাইজ
রোহিঙ্গা নিয়ে আনলিমিটেড তামাশা

কেবল মিয়ানমার বা রোহিঙ্গারা নয়, কম-বেশি প্রায় সব দেশই এ শরনার্থী ইস্যুতে আমাদের পেয়ে বসেছে। আমরা যেখানেই যাই, রোহিঙ্গা বিষয়ে সহযোগিতা চাই। আবার বিদেশি যে বা যারা বাংলাদেশে আসছেন রোহিঙ্গা শরনার্থীদের প্রত্যাবাসনে সহায়তার আশ্বাস দেন। বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা দেন। ছুটে যান কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দেখতে। এ নিয়ে মিডিয়া কাভারেজ হয় ব্যাপক। কিন্তু, বাস্তবটা বড় কঠিন। ২০১৭ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে মিয়ানমার সেনাদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার মুখে আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য ওই বছরেরই নভেম্বরে তড়িঘড়ি করে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে বাংলাদেশ। এই অসম চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পালিয়ে আসা ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ রোহিঙ্গার তালিকা বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে। ‘যাচাই-বাছাই’-এর পর তা থেকে ৬২ হাজার ২৮৫ ব্যক্তিকে ‘ক্লিয়ার’, অর্থাৎ মিয়ানমার থেকে আগত বলে নিশ্চিত করে মিয়ানমার। এই সংখ্যা মিয়ানমারকে দেওয়া তালিকার ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ মাত্র। এই চুক্তির অধীন গত ছয় বছরে একজন রোহিঙ্গাও প্রত্যাবাসিত হয়নি।

 

নতুন পুরনো মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। আশ্রয়শিবিরগুলোতে নতুন শিশু জন্ম হওয়ায় প্রতিবছর সেই সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার করে বাড়ছে। এই চাপ নেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিনের চেয়েও কঠিন। তাদের নিজ দেশে ফেরানোর প্রশ্নে বিদেশিদের ভূমিকা প্রকারান্তরে মিয়ানমারের পক্ষেই থাকছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা ভোট দানে বিরত থেকে এক নাটকীয়তা তৈরি করে। আমাদের অতি বন্ধু, ভারত-চীন-রাশিয়া রোহিঙ্গা প্রশ্নে বরং তামাশাটা একটু বেশিই করে আসছে।  সর্বশেষ চীনের মধ্যস্থতায় কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের আওতায় মোট ৭ হাজার ১৭৬ রোহিঙ্গাকে রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে প্রত্যাবসিত করার এটি তৃতীয় প্রয়াস। এর আগে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রসচিবদের মধ্যে বৈঠকে পরের মাসে সীমিতসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নেওয়া শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারে বিরাজমান পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে এর বিরোধিতা করে। জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রধান মারজুকি দারুসমান তখনো রোহিঙ্গাবিরোধী গণহত্যা চলমান বলে মতপ্রকাশ করেন। তালিকাভুক্ত শরণার্থীদের আপত্তির মুখে এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর প্রায় এক বছর পর ঢাকায় এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আবার প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশের দেওয়া ২২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ‘ক্লিয়ার’ করে মিয়ানমার এবং ২০১৯ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে তাঁরা প্রত্যাবাসিত হবেন বলে ঘোষণা করা হয়। 


আগেরবারের মতোই তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের অসম্মতির কারণে এ প্রয়াস সফল হয়নি। যে কারণে বা যে মোহেই হোক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে গ্যাড়াকলে পড়েছে তা উৎরানোর দৃশ্যত পথ দেখা যাচ্ছে না। বন্ধুরা এখানে বড় চতুর। ক্ষেত্রবিশেষে মজাও দেখে। ২০১৭-২৩ পর্যন্ত ৬ বছরে, ১২ লক্ষ রোহিঙ্গার জন্য বন্ধুদের দেয়া আর্থিক অনুদানের দিকে তাকালেও হিসাবটা পরিস্কার ঝকঝকে হয়ে যায়। এক হিসাবের তথ্য বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ১৬১ কোটি ডলার। আর যুক্তরাজ্য ৪১.৭ কোটি ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৬ কোটি ডলার। অস্ট্রেলিয়া ২৩.৮ কোটি ডলার। জাপান ১৭.৪ কোটি ডলার। যেই ভারত, চীন আমাদের বেশি বন্ধু এবং বেশি পাশে থাকে বলে প্রচারিত তারা কী দিয়েছে? তাদের মধ্যে রাশিয়া দিয়েছে ০.২০ কোটি ডলার, চীন ০.০৪ কোটি ডলার। আর ভারতের সহায়তার কোনো রেকর্ডই নেই।  আরেকটা মজার তথ্য হল, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর মিয়ানমারকে অস্ত্র দিয়ে বেশি সহায়তা করেছে আমাদের এই বন্ধুরাই। এর মাঝে রাশিয়া ৪৯% , চীন ২৯% , ভারত ১৪% । 


রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতা এবং এ ব্যাপারে ভারত, চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা–সমালোচনা হয়েছে। এই দেশগুলোর পক্ষে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকলেও তেমন কোনো উদ্যোগ না নেয়ার নিন্দাও হয়েছে। কিন্তু, এই অঞ্চলের ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশ, দেশগুলোর নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছে। মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগ ১ হাজার ৮৫৩ কোটি ডলার ছুঁয়েছে। ভারতের বর্তমান বিনিয়োগ এর ধারেকাছে না হলেও তাদের সেখানে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা। চীন বা ভারতের যেকোনো একটি দেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে গেলে দেশটি অন্য দেশটির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ব্যবসা-বাণিজ্যের। মিয়ানমারকে চটিয়ে তারা সেখানে ব্যবসা নষ্ট করতে চায় না। 


বিশ্ববাস্তবতা ও রাজনীতি-কূটনীতি এতোই কঠিন তারপরও তাদের কাছেই ছুটতে হয় আমাদের। বয়ে নিতে হচ্ছে ১২ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা। এই বোঝা টানায় পাশে থাকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে বাহানা। উল্লেখ্য , ২০১৭ সালের আগস্টে গণহত্যা ও অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর যে ঢল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে নেমেছিল, তার তিন মাসের মাথায় এই ‘বাস্তুচ্যুত’ জনগণকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। তখনো এই চুক্তির পেছনে ছিল চীন, কিন্তু তারা কোনো দায় নেয়নি। তারা নিজেরাও আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির অংশ হয়নি, এর কোনো আন্তর্জাতিক গ্যারান্টিও ছিল না। চীন সব সময়েই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন-নির্যাতন বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে; কিন্তু চীনের তরফে এর প্রতিবাদ তো দূরে থাক, নিন্দাও শোনা যায়নি।  


এ নিয়ে ভারত বড় সাবধানী। মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে মধুর সম্পর্ক রাখছে তারা।  বঙ্গোপসাগর থেকে চীনকে দূরে রাখা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির ক্ষেত্রে মিয়ানমারের গুরুত্ব রয়েছে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেশের মানুষের কাছেও রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের মতো ঘটনার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ছাড়া ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থও রয়েছে, যা নির্ভর করছে মিয়ানমারের শাসকদের সদিচ্ছার ওপরও। ২০১৫ সালে মণিপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর বহরের ওপর নাগা বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর ভারতীয় বাহিনী ইয়াঙ্গুনের নীরব সম্মতিতে মিয়ানমারের সীমান্তে গোপন অভিযান চালায়। ওই সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায় না ভারত। অথচ রোহিঙ্গা যন্ত্রণা ভারতও পোহাচ্ছে। জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্য অনুযায়ী ভারতে বসবাসকারী রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সংখ্যা আনুমানিক ৪০ হাজার। তাদের মধ্যে অন্তত ২০ হাজার জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস্‌ কমিশন-এ নথিভুক্ত।  এদের বাস ভারতের রাজধানী দিল্লিসহ, জম্মু ও কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, হরিয়াণা ও পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু শিবিরে।  তাদের অনেকের রিফিউজি কার্ড আছে। বিশাল দেশ ভারত এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। কিন্তু, বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা ‘দীর্ঘস্থায়ী’ হতে বসেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ তাহলে কী করবে? কার কাছে যাবে? কার কাছে গেলে কে ক্ষেপে? সব হিসাবনিকাশ করে সবার কাছেই যায়, যেতে হয়। তামাশার শিকারও হতে হয়। 

লেখক: সম্পাদক বাংলাপোষ্ট

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)

মন্তব্য করুন: