• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

কার জয় হবে—নেতার, না জনতার?

প্রকাশিত: ০৭:৪৬, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
কার জয় হবে—নেতার, না জনতার?

কেন্দ্র পরিদর্শন করছেন ইইউ পর্যবেক্ষকরা

জনগণের প্রত্যাশা ছিল—মৌলিক পরিবর্তন আসবে। চব্বিশের আন্দোলনের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন ও গণভোট। মানুষ ভেবেছিল, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে; ব্যক্তি ও সমষ্টির দীর্ঘদিনের সংঘাতময় সম্পর্কের অবসান ঘটবে। ধারণা ছিল, সবার উন্নতির ভেতর দিয়েই ব্যক্তি মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে।

কিন্তু বাস্তবতা সে পথে এগোয়নি। বরং দেখা গেল, ব্যক্তি বড় হয়ে উঠছে সমষ্টির কাঁধে পা রেখে। এতে সমষ্টি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি ব্যক্তিও প্রকৃত অর্থে উচ্চতায় উঠতে পারেনি। বাঙালি আগেও প্রান্তিক ছিল, এখনও সেই প্রান্তিকতাই রয়ে গেছে। ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব ক্রমে সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সর্বত্র একই চিত্র—কলহ, দাঙ্গা, হানাহানি, ছিনতাই, খুনোখুনি।

 

পথে-ঘাটে ছিনতাই যেমন ঘটে, রাষ্ট্রক্ষমতাও তেমনি একাধিকবার ছিনতাই হয়েছে। এরশাদের ক্ষমতা দখল ছিল কতিপয়ের স্বার্থরক্ষার ফল, যা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার পতন ঘটলেও, পরবর্তী নির্বাচনগুলো পুরোনো নীতির বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। জনগণের প্রকৃত লাভ হয়নি; উপকৃত হয়েছে অল্প কিছু মানুষ।

জনগণের শ্রমে সৃষ্ট সম্পদ আত্মসাৎ করে যে ব্যক্তির উত্থান, তাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর মুক্তি চায়নি; চেয়েছিল সবার মুক্তি, যাতে প্রত্যেক মানুষ স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পায়। সেই চেতনার আরেক নাম প্রকৃত গণতন্ত্র—যেখানে স্বৈরাচারের স্থান নেই, ছদ্মবেশী হোক বা বৈধতার মোড়কে আবৃত। মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল লক্ষ্য।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নির্বাচনের মাধ্যমে কিংবা জবরদখলের মাধ্যমে—যেভাবেই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন—যদি তা অল্পসংখ্যকের স্বার্থ রক্ষা করে, তবে তাকে স্বৈরাচার ছাড়া অন্য কিছু বলা কঠিন। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়; সমগ্র পুঁজিবাদী বিশ্বেই একই প্রবণতা লক্ষণীয়। পুঁজিবাদের দর্শনই এমন—যাদের পুঁজি আছে তারাই ‘যোগ্য’, আর শ্রমজীবীরা যেন স্বভাবতই ‘অযোগ্য’। ফলে যে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা অল্পসংখ্যকের স্বার্থকেই পুষ্ট করে।

এই ব্যবস্থার বহুমুখী কুফল স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও স্বেচ্ছাচারিতার নজির বিশ্বরাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসী নীতি বিশ্বব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পুঁজিবাদ উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—যা শ্রমজীবী মানুষের শ্রম থেকেই সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই সৃষ্ট সম্পদের মালিকানা থাকে অন্যের হাতে। ফলে বৈষম্য ও অপরাধ বাড়তেই থাকে। বিচারব্যবস্থা প্রসারিত হয়, কিন্তু অপরাধের উৎস অক্ষত থাকে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

এ ব্যবস্থার আরেকটি ফল মৌলবাদের উত্থান। ইতিহাসে দেখা গেছে, ভূরাজনৈতিক স্বার্থে উগ্রবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়েছে। পরে সেই শক্তিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তবে মৌলবাদ ও পুঁজিবাদের মধ্যে দৃশ্যত পার্থক্য থাকলেও আদর্শগত মিল অস্বীকার করা যায় না—উভয়েই ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, সমষ্টির কল্যাণকে নয়।

মৌলবাদ আধ্যাত্মিকতার কথা বললেও বাস্তবে ব্যক্তিগত ‘মুক্তি’ ও ‘পুণ্য’কে এক ধরনের পুঁজি হিসেবে বিবেচনা করে। পুঁজিবাদ যেমন বস্তুগত মুনাফা চায়, মৌলবাদ তেমনি ব্যক্তিগত পরিত্রাণ ও প্রভাবের মুনাফা চায়। উভয় ক্ষেত্রেই সমষ্টিগত অগ্রগতি উপেক্ষিত হয়।

পুঁজিবাদের দুই মুখ—উদারনীতি ও ফ্যাসিবাদ। একদিকে ভদ্রতার মুখোশ, অন্যদিকে নগ্ন আগ্রাসন। কিন্তু লক্ষ্য এক—প্রবলকে টিকিয়ে রাখা, দুর্বলকে প্রান্তিক করা। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদও একইভাবে ব্যক্তিস্বার্থের রক্ষক।

সমাজতন্ত্রের প্রতি তাদের বিরূপতা এখানেই—সমাজতন্ত্র ব্যক্তিকে নয়, সমষ্টিকে শক্তিশালী করতে চায়। সবার অগ্রগতির মধ্য দিয়েই ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে চায়। পুঁজিবাদ যেখানে অল্পের মঙ্গল চায়, সমাজতন্ত্র সেখানে সবার সমান অগ্রগতি কামনা করে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন থেকেই যায়—বর্তমান নির্বাচন কতখানি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে? প্রকৃত মুক্তি কি সত্যিই আসবে? নাকি আবারও ক্ষমতার পালাবদল হবে, কিন্তু ব্যবস্থার মূল কাঠামো অক্ষত থাকবে?

এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বড় একটি ‘কিন্তু’।

মন্তব্য করুন: