শৃঙ্খলা ও সংযমের প্রতীক এই সেনাবাহিনীই কেন চায় বাংলাদেশ
ছবি: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার
ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সাম্প্রতিক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের রাজনীতির একটি গভীর ও উদ্বেগজনক দিক উন্মোচন করেছে। জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা–১৭ আসনের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামানের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের বাকবিতণ্ডা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, আইন মান্যতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নকে সামনে এনেছে। যে সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জাতির স্বাধীনতা অর্জনে আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাস গড়েছে, পরবর্তী দশকগুলোতে দুর্যোগে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই একই সেনাবাহিনী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থির সময়ে সংযম, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবমাননাকর আচরণ কেবল ব্যক্তিগত শালীনতার ব্যত্যয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, জনআকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্বশীল স্থিতিশীলতার প্রতিও অবজ্ঞার শামিল।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ক্যান্টনমেন্ট এলাকা একটি বিশেষ নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, বিশেষ করে অস্ত্র বহন করে প্রবেশ, আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা সেই আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে থামিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই নির্দেশনা মেনে নেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী অশোভন আচরণ, অশ্রাব্য ভাষা এবং প্রকাশ্য ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই আচরণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে এটি কি কেবল দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা ছিলো, নাকি এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ভয় দেখানো বা অবমাননার কোনো উদ্দেশ্য নিহিত ছিলো? যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক না কেন, এমন আচরণ একটি সংবেদনশীল নিরাপত্তা এলাকায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ ধরনের আচরণ শুধু ব্যক্তিগত শালীনতার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় আইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি অবজ্ঞার শামিল। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত মর্যাদা বা সামাজিক অবস্থানই কাউকে আইন ভঙ্গের অধিকার দেয় না। বরং প্রশ্ন উঠতেই পারে - কোন সাহসে একজন সংসদপ্রার্থী নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন এবং একটি উচ্চনিরাপত্তা এলাকায় কর্তব্যরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন?
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এর বিপরীতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আচরণ। তারা পুরো পরিস্থিতিতে সংযত, শান্ত ও পেশাদার ছিলেন। কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে তারা দায়িত্বের সীমার মধ্যেই আচরণ করেছেন। এই সংযম ও পেশাদারিত্বই দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী শক্তির প্রদর্শনে নয়, দায়িত্ব পালনে বিশ্বাসী। আজকের বাংলাদেশ ঠিক এমনই একটি সেনাবাহিনী চায়।
বাংলাদেশ একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার ও অপ্রচলিত হুমকি, সব মিলিয়ে একটি পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নিরপেক্ষ সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। এই বাহিনী শুধু সীমান্ত রক্ষা করে না; দুর্যোগে জনগণের পাশে দাঁড়ায়, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে, এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।
এই প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক প্রার্থীর পক্ষ থেকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। এটি কি কেবল ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ, নাকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন? একটি রাজনৈতিক দল যদি সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়, তবে তাকে প্রথমেই রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
গণতন্ত্র মানে প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করা, কিন্তু সেই প্রশ্ন হতে হবে যুক্তিসংগত, আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল। ক্যান্টনমেন্টের মতো সংবেদনশীল এলাকায় আইন অমান্য করা বা কর্তব্যরত সেনাসদস্যদের অপমান করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক আচরণ নয়। বরং এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করার ইঙ্গিত বহন করে।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র পরিচালনা কণ্ঠস্বর উঁচু করার প্রতিযোগিতা নয়; এটি সংযম, দায়িত্ববোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধার বিষয়। বাংলাদেশ এমন রাজনীতি চায়, যা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে, নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না।
সশস্ত্র বাহিনীর শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ এই মুহূর্তে জাতির জন্য আশ্বস্তকর।
বিপরীতে, রাজনৈতিক অশোভনতা আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। কেমন নেতৃত্ব বাংলাদেশ চায়, আর কেমন নেতৃত্ব রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। সামনে থাকা ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কি একটি অগ্রগামী, উদার, গণতান্ত্রিক ও প্রবৃদ্ধিমুখী রাষ্ট্র হিসেবে সামনে এগোবে, নাকি অতীতের কর্তৃত্ববাদী অভিজ্ঞতার চেয়েও আরও অন্ধকার এক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দেওয়া হবে।
লেখক: বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/এআই



মন্তব্য করুন: