ঈদ যাত্রায় এতো কান্না কেন?
দুর্ঘটনায় নিহত স্বজনদের এই আহাজারি শোনার কেউ নেই!
যথারীতি কথার ফুলঝুরি ছিল মন্ত্রীদের কণ্ঠে। এবারের ঈদ যাত্রা নাকি আগের যেকোন সময়ের চেয়ে স্বস্তির হবে! অনেক আশায় ছিলাম আমরা। কিন্তু বাস্তবে সড়কে প্রাণহানি দেখলাম। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন কয়েকশো মানুষ। যাদের পরিবারের দিন কাটছে আতঙ্ক, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়।
বরাবরের মতো এবারও অনলাইন সিন্ডিকেট, টিকিট কালোবাজারি, বাড়তি ভাড়া আদায়, অব্যবস্থাপনা, শিডিউল বিপর্যয়, পথে পথে যানজট-ভোগান্তি-সবকিছুই দেখেছি আমরা। সড়কে প্রাণহানির ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। অকালে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। কত স্বপ্ন মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশভরা বিষাদে। এবারও নিহতদের স্বজনের আহাজারিতে ছুঁয়ে গেছে সবার মন। কারণ, একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না!
ঈদের ফিরতি যাত্রায় রবিবার সারাদেশে একদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জন, ফেনীতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন, হবিগঞ্জে বাসের সঙ্গে পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে চারজন, নাটোরে একজন, সুনামগঞ্জে একজন, কিশোরগঞ্জে দুই বন্ধু এবং কুড়িগ্রামে একজন নিহত হয়েছেন।
সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লায়। শনিবার (২১ মার্চ, ২০২৬) দিবাগত রাত ৩টার দিকে জেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় মামুন পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে যাওয়া মেইল ট্রেন। এই ধাক্কায় বাসটিকে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায় ট্রেনটি। এতে প্রথমে ৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও পরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ জনে। ঘটনার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় রেলক্রসিংয়ের দুই গেটম্যানকে বরখাস্ত করা হয়। নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তার ঘোষণা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর দুর্ঘটনার কারণ জানতে গঠন করা হয়েছে আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি।
ঈদের আগে বুধবার (১৮ মার্চ, ২০২৬) বগুড়ায় সান্তাহার জংশনের কাছাকাছি ছাতনীগ্রামের বাগবাড়ি এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন। ৯ বগি লাইনচ্যুত হয়ে আহত হন শতাধিক যাত্রী। এতে দীর্ঘ ২২ ঘণ্টা বন্ধ থাকে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলা-নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ। চরম ভোগান্তির শিকার হন ঈদে ঘরমুখো মানুষ। এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখবে কী না, আর দেখলেও সুপারিশমালার বাস্তবায়ন হবে কী না-তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। কারণ, আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো না। তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আজ কোন কিছু লিখবো না। আজ সড়ক নিরাপত্তা আর ঈদ যাত্রা নিয়ে বাহাসের কথা লিখবো। জনগণের সঙ্গে প্রতারণার কথা লিখবো। জবাবদিহিতার কথা লিখবো। যদিও এসব কারও লাগবে না। মানে কারও কিছু যায় আসে না! যাদের পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন-তারাই কেবল অনুধাবন করবেন। আক্ষেপ করবেন। বিলাপ করবেন। কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা কোনদিন ফিরবে কী না-তা কেবলই অনামিশা। কথার ফুলঝুরিতে ঘুরপাক খেতে থাকবে অনন্তকাল!
ঈদ যাত্রা নিয়ে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি থাকে সবসময়। সড়ক-মহাসড়ক রাতের অন্ধকারে সংস্কার করা হয়। দূরপাল্লার বাস মেরামতের পাশাপাশি ট্রিপ সংখ্যা বাড়ানো হয়। দূরত্ব অনুযায়ী বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়। বাস টার্মিনালগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। বাস মালিক সমিতিও আশ্বাসে সরকারের পাশে থাকে। যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। যত কথাই বলা হোক, ট্রেন আর লঞ্চের ছাদে যাত্রী উঠানো বন্ধ হয় না। ঈদ যাত্রা বলে অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করা হয়। কারণ, ঈদ আনন্দের জন্য মানুষ সানন্দে ভোগান্তি মেনে নেয়। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে গেলেই ভুলে যায় পথের যত ক্লান্তি।
অবাক করা বিষয় হলো-এবার বাসের থেকে বেশি আলোচনায় ট্রেন। নিরাপদ এই বাহনটি দিনকে দিন মানুষের মনে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। থামছেই না লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা। প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছেন তিনজন। দেশে বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের চেয়ে অবৈধ ক্রসিংই বেশি। রেল মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে লেভেল ক্রসিংয়ে মারা গেছে ২৬৩ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসেব মতে, ২০১৯ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৬৯ জন। রেলওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৯ হাজার ২৩৭ জন। প্রতিদিন গড়ে তিনজন রেল দুর্ঘটনায় মারা যায়।
এসব দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তা কোন সুফল বয়ে আসছে না। বিশেষজ্ঞরা রেলওয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তারা বলছেন, ট্রেন পরিচালনার নিচের স্তরে থাকা কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দায় সারে রেলওয়ে। এসব দুর্ঘটনার জন্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না। ট্রেন দুর্ঘটনার সঙ্গে ওপরের সারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়না। কেননা, যেসব কমিটি গঠন করা হয়, সেখানে শুধু রেলের কর্মকর্তারা থাকেন। তাঁরাও সহকর্মীদের অবহেলার বিষয়টি তদন্তে এড়িয়ে যান। অথচ অন্যান্য দেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দায় স্বীকার করে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদত্যাগ করতে দেখি আমরা। বাংলাদেশে এটা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়!
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সবে কাজ শুরু করেছেন। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব খুব সহজ কাজ নয়। এরওপর মন্ত্রী হিসেবে অতিকথন রবিউল আলমকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছে। অনেকে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরর সঙ্গে তুলনাও করছেন। যা মোটেই সুখকর নয়। তাই মন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর ফ্যাসিস্ট সরকারের কারো কারো ছায়া দীর্ঘ হলে সরকার ও দল হিসেবে বিএনপি ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। এ কারণে দ্রুততম সময়ে ভুলগুলে শুধরে নিয়ে সামনের দিকে এগোতে হবে। কথায় নয়, কাজে বড় হতে হবে।
আরেকটি পরিসংখ্যান জানিয়ে শেষ করবো আজকের লেখা। সারা দেশে রেলপথে ক্রসিং আছে ২ হাজার ৮৫৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬১টিরই অনুমোদন নেই। আবার ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৩২টি ক্রসিংয়েই গেটম্যান নেই। এমন বাস্তবতায় লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা বন্ধে বাস্তবমুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে রেলওয়েকে। একইসঙ্গে ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেনশন করা ছাড়া সামনে কোনো পথ খোলা নেই। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বন্ধে জনগণকে সচেতন হতে হবে। সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। কারণ প্রতিটি জীবন অমূল্য। আর এই জীবন আপনার বা আমাদের কারও না কারও প্রিয়জনের!
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: