• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্বব্যাপী হাম-এর পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

ড. আরমান রহমান, আয়ারল্যান্ড 

প্রকাশিত: ১৬:৫২, ৩১ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ১৬:৫৪, ৩১ মার্চ ২০২৬

ফন্ট সাইজ
বিশ্বব্যাপী হাম-এর পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

ছবি: ড. আরমান রহমান

একসময় বিশ্বের বহু দেশে প্রায় নির্মূলের পথে থাকা হাম (Measles) রোগ আবার উদ্বেগজনকভাবে ফিরে আসছে। গত দুই বছরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো হাম রোগের বৈশ্বিক পুনরুত্থান সম্পর্কে সতর্ক করে আসছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত শিশুর টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়াই এর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক প্রবণতার স্থানীয় প্রভাব অনুভব করছে।

বিশ্বজুড়ে হাম রোগের পুনরায় বিস্তার
বিশ্বব্যাপী হাম সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ টিকাদানের হার ৯৫%–এর নিচে নেমে গেছে — যা হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহামারির সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা জরুরি সেবায় মনোযোগ দেওয়ায় কোটি কোটি শিশু নির্ধারিত টিকা নিতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও সামাজিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী বেড়েছে এবং হাম, যা বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি, আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে — এমনকি যেসব দেশ আগে হাম নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছিল, সেখানেও নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হাম রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগর অঞ্চল যেমন ঢাকায়। দুঃখজনকভাবে, হাম ও এর জটিলতায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সফল জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মহামারিজনিত সেবা ব্যাহত হওয়া, জনসংখ্যার চলাচল বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও স্বাস্থ্যসেবায় অসম প্রবেশাধিকার — এসব কারণে কিছু এলাকায় টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে।

হাম রোগ শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এবং অত্যন্ত সংক্রামক। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২–১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এবং মৃত্যুসহ গুরুতর জটিলতার ঝুঁকিতে থাকে।

কেন এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে শুধু একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি আসলে একটি বৈশ্বিক মহামারিবিদ্যাগত প্রবণতার অংশ। হাম রোগের প্রাদুর্ভাব প্রায়ই নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করে। টিকাদানের হার সামান্য কমলেও ভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণক্ষমতার কারণে দ্রুত বড় আকারের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে টিকা-নির্ভর জনস্বাস্থ্য অর্জনগুলো ধরে রাখতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়া ও করণীয়
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নজরদারি জোরদার, সংক্রমণ ক্লাস্টার তদন্ত এবং পুনরায় টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে হাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।

প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত:
* নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের জন্য ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ
* টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি
* টিকাবিরোধী ভুল তথ্য মোকাবিলা
* দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা উন্নত করা

কমিউনিটি সম্পৃক্ততা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের শিশুদের সময়মতো MR/MMR টিকা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও সামাজিক নেতাদের টিকাদান বিষয়ে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ

হাম সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, কারণ এর জন্য নিরাপদ ও কার্যকর টিকা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনস্বাস্থ্যের অর্জনগুলো স্থায়ী নয়; এগুলো বজায় রাখতে নিয়মিত বিনিয়োগ, সচেতনতা এবং শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সম্মিলিত সচেতনতার মাধ্যমে দেশ আবারও হাম রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক:  ড. আরমান রহমান, 
ইউসিডি স্কুল অভ মেডিসিন, আয়ারল্যান্ড 

বিভি/এমআর

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত