• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

অর্থপাচার মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোই প্রথম প্রতিরক্ষা দেয়াল

মনজুর মোরশেদ পাটোয়ারী

প্রকাশিত: ১১:০৫, ২৬ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ১১:০৯, ২৬ মার্চ ২০২৬

ফন্ট সাইজ
অর্থপাচার মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোই প্রথম প্রতিরক্ষা দেয়াল

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে মানি লন্ডারিং বা অর্থপাচার কেবল স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত বৈশ্বিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ওয়াশিংটন ডিসি—সবখানের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যখন এই অপরাধ দমনে কঠোর নিয়ম চালু করছে, তখন আসল লড়াইটা চলছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল লেজার বা হিসাবের খাতায়। বাংলাদেশের মতো একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য এই লড়াইয়ের গুরুত্ব অস্তিত্ব রক্ষার মতো। কারণ, অবৈধ অর্থপাচার কেবল রাজস্ব ক্ষতিই নয়, বরং এটি জাতীয় রিজার্ভের ওপর সরাসরি আঘাত হানে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেয়।

 

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: কঠোর বাস্তবতার মুখে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

২০২৬ সালে বৈশ্বিক অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং (AML) ব্যবস্থা আর কেবল নিয়মরক্ষার ‘বক্স-টিকিং’ বা কাগজপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন ব্যাংকগুলোর কাছে প্রমাণ চায় যে তাদের তদারকি ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে কার্যকর কি না। গত কয়েক বছরে অর্থপাচার রোধে ব্যর্থতার দায়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকগুলোর ওপর রেকর্ড পরিমাণ জরিমানা করা হয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের টিডি ব্যাংক (TD Bank)। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ব্যাংকটি ৩.০৯ বিলিয়ন ডলারের বিশাল জরিমানার পাশাপাশি ‘অ্যাসেট ক্যাপ’ বা সম্পদ বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। তদন্তে দেখা গেছে, ব্যাংকটির গ্লোবাল এএমএল বিভাগ একটি ‘জিরো এক্সপেন্স গ্রোথ প্যারাডাইম’ নীতির অধীনে কাজ করছিল, যেখানে ব্যবসার পরিধি বাড়লেও কমপ্লায়েন্স বাজেট বাড়ানো হয়নি। এর ফলে ব্যাংকটি ৯২% লেনদেন মনিটর করতে ব্যর্থ হয়, যা প্রায় ১৮.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। টিডি ব্যাংকের এই ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে ড্রাগ কার্টেলগুলো সহজেই কয়েক শ মিলিয়ন ডলার পাচার করতে সক্ষম হয়েছে।

একইভাবে, যুক্তরাজ্যের নেশনওয়াইড (Nationwide) বিল্ডিং সোসাইটিকে ৪৪.১ মিলিয়ন পাউন্ড এবং বার্কলেস (Barclays) ব্যাংককে মোট ৩৯.৩ মিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে। এমনকি কানাডার ব্যাংক অফ মন্ট্রিয়ল (BMO) প্রায় ১৪ বছর ধরে ১ লাখের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে ভুলভাবে ফি আদায়ের মাধ্যমে গ্রাহক সুরক্ষায় গাফিলতির প্রমাণ দিয়েছে, যার ফলে তাদের ৪ মিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, ব্যাংকগুলো যদি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়ে।

অর্থপাচার যেভাবে কাজ করে: এবিসি কোম্পানি লিমিটেডের উদাহরণ

বাংলাদেশে অর্থপাচারের জটিল প্রক্রিয়াটি বুঝতে আমরা একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান ‘এবিসি কোম্পানি লিমিটেড’-এর কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে পারি। সাধারণত তিনটি ধাপে এই পাচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়:

১. প্লেসমেন্ট (Placement): এবিসি কোম্পানি ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে বা অপ্রদর্শিত আয় ব্যবহার করে শিল্পযন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি (LC) খোলে। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ২৮.৫৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

২. লেয়ারিং (Layering): পাচারকারীরা একটি বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে ১ মিলিয়ন ডলারের যন্ত্রপাতির দাম ৫ মিলিয়ন ডলার দেখিয়ে ‘ওভার-ইনভয়েসিং’ করে। ব্যাংক বৈধভাবেই ৫ মিলিয়ন ডলার বিদেশে পাঠায়। এই প্রক্রিয়ায় বাড়তি ৪ মিলিয়ন ডলার বিভিন্ন ‘শেল কোম্পানি’ বা বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূল উৎস থেকে দূরে সরিয়ে ফেলা হয়।

৩. ইন্টিগ্রেশন (Integration): পরিশেষে এই ৪ মিলিয়ন ডলার লন্ডন, দুবাই বা সিঙ্গাপুরে বিলাসদ্রব্য বা রিয়েল এস্টেট কিনতে ব্যবহৃত হয়। এটি তখন পুরোপুরি বৈধ ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হিসেবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মিশে যায় এবং পাচার করা টাকা ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমেও এবিসি কোম্পানি জালিয়াতি করতে পারে। তারা হাজার হাজার মানুষের নাম ব্যবহার করে ভুয়া এমএফএস (MFS) অ্যাকাউন্ট খুলে ছোট ছোট পরিমাণে টাকা পাঠায় (Smurfing), যা পরবর্তীতে ‘স্টেবলকয়েন’ (যেমন—USDT) আকারে বিদেশের ডার্ক ওয়েবে পাচার হয়।

এআই এবং জালিয়াতির নতুন সীমান্ত: এরাপ (Arup)-এর উদাহরণ

২০২৬ সালে পাচারকারীরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এজেন্টিক এআই’ ব্যবহার করে ব্যাংকগুলোকে ধোঁকা দিচ্ছে। হংকংয়ের একটি বহুজাতিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ‘এরাপ’ (Arup) ২০২৪ সালে ২৫.৬ মিলিয়ন ডলার হারায়, যখন তাদের এক কর্মী একটি ভিডিও কলে তার সিএফও এবং সহকর্মীদের অবিকল রূপ (ডিপফেক) দেখে বিভ্রান্ত হন। অপরাধীরা ইউটিউব ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কর্মকর্তাদের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে এই ডিপফেক তৈরি করেছিল।

বর্তমানে প্রায় ৮৪% অবৈধ ভার্চুয়াল লেনদেন হয় স্টেবলকয়েনের মাধ্যমে, যা ট্র্যাক করা ব্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ‘টিপস’ বা সাবস্ক্রিপশন ফি হিসেবে টাকা পাঠিয়ে সেটিকে বৈধ আয় হিসেবে দেখানোর প্রবণতা (Micro-laundering) বাড়ছে, যা ব্যাংকের সাধারণ অ্যালার্ট সিস্টেমে ধরা পড়ে না।

ব্যাংকগুলো যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে

তদারকির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকায় ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোকে নিম্নোক্ত আধুনিক পদক্ষেপ নিতে হবে:

১. রিয়েল-টাইম ট্রেড অ্যানালিটিক্স ও প্রাইস বেঞ্চমার্কিং: আমদানিকৃত পণ্যের দাম বৈশ্বিক গড় দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সিঙ্গাপুরের ‘নেটওয়ার্কড ট্রেড প্ল্যাটফর্ম’ (NTP)-এর মতো ডিজিটাল উইন্ডো ব্যবহার করে ইনভয়েস জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব। এটি আমদানিকারকের ঐতিহাসিক লেনদেন এবং কাস্টমস পারমিট ডেটার সঙ্গে তথ্য যাচাই করে জালিয়াতি শনাক্ত করে।

২. প্রকৃত মালিকানা যাচাই (Ultimate Beneficial Owner - UBO): একটি লেনদেনের পেছনে প্রকৃত সুবিধাভোগী কে, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেক সময় ‘শেল কোম্পানি’র আড়ালে প্রভাবশালীরা অর্থপাচার করে। একটি কেন্দ্রীয় UBO ডেটাবেজ থাকলে ব্যাংকগুলো সহজেই আসল মালিককে শনাক্ত করতে পারবে এবং বেনামি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমাতে পারবে।

৩. এআই-ভিত্তিক বিহেভিয়ারাল মনিটরিং (Behavioral Monitoring): কেবল টাকার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে অ্যালার্ট না দিয়ে গ্রাহকের লেনদেনের ধরন বা ‘প্যাটার্ন’ বিশ্লেষণ করতে হবে। যদি কোনো গ্রাহক হঠাৎ করে তার স্বাভাবিক আচরণের বাইরে লেনদেন করে, তবে এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা ব্লক করে দেবে। এটি প্রথাগত সিস্টেমের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করতে পারে।

৪. ‘লাইভনেস’ ডিটেকশন ও বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি: কেওয়াইসি (KYC) এর জন্য এবং ডিপফেক রুখতে অত্যাধুনিক ‘লাইভনেস চেক’ প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি মানুষের চামড়ার গঠন বা চোখের মণির নড়াচড়া বিশ্লেষণ করে জালিয়াতি ধরতে পারে। এরাপের মতো জালিয়াতি রুখতে ভিডিও কলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ভেরিফিকেশন চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা জরুরি।

৫. আন্তঃব্যাংক তথ্য আদান-প্রদান: ইউএস ফিনসেন (FinCEN)-এর সেকশন ৩১৪(বি) মডেল অনুযায়ী, সন্দেহভাজন লেনদেনের তথ্য ব্যাংকগুলো রিয়েল-টাইমে একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে। এতে একজন পাচারকারী একটি ব্যাংক থেকে ব্লক হয়ে অন্য ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পাবে না।

মানি লন্ডারিং একটি অদৃশ্য যুদ্ধ, যা আমাদের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আমাদের ব্যাংকগুলোকে কেবল লেনদেনের মাধ্যম হলে চলবে না, বরং প্রযুক্তিনির্ভর অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ই পারে অর্থপাচারের এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে। জাতীয় সম্পদ রক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই।


লেখক পরিচিতি:
লেখক একজন ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকিং অ্যান্ড ট্রেড ফিন্যান্স স্পেশালিস্ট। তাঁর সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্রেড ফিন্যান্স, এএমএল, টিবিএমএল এবং বৈশ্বিক কমপ্লায়েন্স অপারেশনে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

 

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)

মন্তব্য করুন: