• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

আইসিইউ নিয়ে ভুল ধারণা...

ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ২১:৩৯, ২৭ মার্চ ২০২৬

ফন্ট সাইজ
আইসিইউ নিয়ে ভুল ধারণা...

দিনটি শুরু হলো এক হাতে চায়ের কাপ, অন্যদিকে পত্রিকা। ঈদের দীর্ঘ ছুটির পর (২৬ মার্চ) পত্রিকাটা পই পই করে সব হেডলাইন দেখতে দেখতে একটি খবরে চোখ আটকে গেল। প্রথম আলোর ১৬ পাতায় “রাজশাহী মেডিক্যালে আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা ৩৩ শিশুর মৃত্যু ১১ দিনে”। মহান স্বাধীনতা দিবসের সকালটা একাধিক শোকাতুর খবর নিয়ে শুরু হলো। আরিচায় চালকের অবহেলায় বাস নদীতে পড়ে ২৫ জনের লাশ উদ্ধার।

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিখতে বসেছি। আমার লেখার টাইটেল “আইসিইউ নিয়ে ভুল ধারণা”।

লক্ষ্য করুন- আমি কিন্তু ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ বলিনি, সরাসরি ভুল তথ্য বলেছি। অর্থাৎ, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলেছি, চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি অতীব প্রয়োজনীয় বিভাগ আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)/ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট কিংবা বাংলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। উন্নত বিশ্বে এই আইসিইউর প্রচলন অনেক আগে হলেও বাংলাদেশে এর যাত্রা শুরু আশির দশকে। তখন শুধুমাত্র সরকারি বড় হাসপাতালগুলো এবং পিজি হাসপাতাল ও বারডেমে আইসিইউর প্রচলন শুরু হলেও গর্বের বিষয় হচ্ছে, আজ ঢাকাসহ সারা দেশে অগণিত আইসিইউ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও, সব আইসিইউ পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত নয়।

আইসিইউ বিষয়ক লেখার বিস্তারিত পূর্বে যাওয়ার আগে এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে ২/১টা তথ্য উপস্থাপন করতে চাই।

আঠারো কোটি মানুষের এই দেশে সরকারের একার পক্ষে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই, বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের জন্ম। শুনলে অবাক হবেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে থাকে। বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগ উভয় ক্ষেত্রেই বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের অংশীদারিত্ব বেশি। অর্থাৎ, হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা, আইসিইউ এবং রোগ নির্ণয়কেন্দ্র সব ক্ষেত্রেই। তবে, এই ক্ষেত্রে তারকা মানের হাসপাতাল যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। এসব নিম্নমানের সেন্টারগুলোর নেতিবাচক খবর প্রচার হলে ঢালাওভাবে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উপর প্রভাব পড়ে। সাধারণ জনগণ বিভ্রান্ত হন। তাই, রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ; আর একটি মানহীন, মেশিন ও জনবলহীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেন অনুমোদন না দেওয়া হয়।

এবার আসা যাক মূল আলোচনায়। একটা সময় ছিল, ছোট ছোট অপারেশনেও রোগীর মৃত্যুর খবর শোনা যেত। চিকিৎসকদের কিছুই করার থাকত না। কিন্তু, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষে সে দিন বদলেছে। আইসিইউর অপরিহার্য মেশিনটির নাম হচ্ছে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র। এটিকে ঘিরেই মিথ্যা, বানোয়াট, ভুল, বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্যের ছড়াছড়ি।

গুরুতর অসুস্থ রোগী (শিশু থেকে বৃদ্ধ) যখন প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের চাহিদা নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে পূরণ করতে পারে না, তখনই এই যন্ত্রটি ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এটি এক অতি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র, যা হার্ট ফেইলিওর, তীব্র শ্বাসকষ্টের রোগী, একিউট অ্যাজমার রোগী, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেকাংশেই মৃত্যু পথযাত্রী রোগীরা এই ভেন্টিলেটরের কল্যাণে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, কোনো রোগীকে যখন জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে ভেন্টিলেটর মেশিনে দেওয়া হয়, তখনই স্বজনেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেতিবাচক কথোপকথন শুরু করেন। সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চশিক্ষিত, যে কোনো শ্রেণি-পেশার বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন ভেন্টিলেটরে দেওয়া মানে রোগী মারা গেছে। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ভুঁইফোড় অনিবন্ধিত ভুয়া অনলাইনে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে, তিন দিন ধরে রোগী মারা গেছে, তাকে বিল বাড়ানোর জন্য আইসিইউতে রেখে দিয়েছে হাসপাতাল।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যা, কলঙ্কিত নির্লজ্জ মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য; যা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই প্রচার করা সম্ভব। পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে চিকিৎসাসেবা নিয়ে এমন নগ্ন কুৎসা রটানোর কোনো সুযোগ নেই।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, মারা যাওয়ার ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে শরীর শক্ত হতে থাকে, যাকে মেডিকেল পরিভাষায় Rigor mortis বলা হয়। তখন বুকের পাঁজরের পেশী শক্ত হতে থাকে, ফলে ভেন্টিলেটর মেশিন চাইলেও কাজ করতে পারবে না এবং মেশিনের তীব্র বিরামহীন অ্যালার্মে চারদিক প্রকম্পিত হতে থাকবে। মৃত্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস, নাড়ি ও রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়। দুই ঘণ্টা পর থেকে শুরু হয় পচন (Putrefaction)। পচনের প্রথম লক্ষণ পেটের ডান নিচের দিকে সবুজাভ দাগ; পরে দুর্গন্ধ, ফোলা এবং skin peeling হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন নেতিবাচক কথা? কারণ, প্রথমত পকেটের টাকা দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়; চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো বাজেট থাকে না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্য বীমা থাকলেও বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রটি একেবারেই ফাঁকা। দ্বিতীয়ত, রোগীর দূরপাল্লার অনাকাঙ্ক্ষিত স্বজনেরা হাসপাতালে এসে চিকিৎসাকার্য্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এবং কুৎসা রটায়। তৃতীয়ত, রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতির যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের অভাব। এছাড়া পাড়া-মহল্লার ভাড়া করা বাড়িতে ঘুপচির মতো জায়গায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, অপেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেও এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে।

অথচ বাংলাদেশে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনে সর্বোচ্চ ডিগ্রি ডক্টর অব মেডিসিন (এমডি) প্রদান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এই বিষয়ে অনেক পারদর্শী চিকিৎসক আইসিইউতে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করে জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের নিয়মিত বাঁচিয়ে তুলছেন। তবুও সাধারণ থেকে উচ্চশিক্ষিত মানুষের আইসিইউ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুল ও নেতিবাচক মন্তব্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতের অগ্রযাত্রাকে দারুণভাবে ব্যাহত করছে। তাই প্রয়োজন ইতিবাচক, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন। তাহলে এদেশ ছেড়ে চিকিৎসার জন্য মানুষ অহরহ পাড়ি দেবে না; দেশেই যৌক্তিক মূল্যে মিলবে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা।

 

লেখক: ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্তী
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।
ও ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত