জেনারেল মামুন খালেদের রক্তচক্ষু ও হাছান মাহমুদের চাপ
জেনারেল মামুন খালেদ ও লেখক মুনির চৌধুরী
জেনারেল মামুন খালেদ ছিলেন এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সামরিক কর্মকর্তা। আর আমি তখন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিরেক্টর (এনফোর্সমেন্ট) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। দায়িত্বের অংশ হিসেবে বহু রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং প্রভাবশালীদের দখল থেকে নদী, খাল, জলাশয়, পাহাড় ও বনভূমি উদ্ধার করছিলাম।
একদিকে মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের চাপ, অন্যদিকে কর্পোরেট শক্তির হুমকি—দুই দিক থেকেই প্রবল বাধার মুখে পড়তে হচ্ছিল। ঢাকা বিমানবন্দরের অদূরে প্রায় ২৫০ একর প্রাকৃতিক জলাশয়, সাধারণ মানুষের জমি, এমনকি কবরস্থান দখল করে গড়ে উঠছিল ‘আসিয়ান সিটি’ নামের একটি বিশাল আবাসন প্রকল্প—যার পুরোটাই ছিল অবৈধ।
প্রশাসন, রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পুলিশ—সবার নীরবতায় অসহায় মানুষের কান্না আর অভিশাপে আকাশ যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। অসংখ্য অভিযোগ জানানো হলেও কোনো প্রতিকার মিলছিল না। এমনকি রাজউকের চেয়ারম্যানও আমাকে বলেছিলেন, “মুনীর চৌধুরী—আমি অসহায়।”
অবশেষে সাহস করে অভিযানে নামলাম। অবৈধ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা জব্দ করে অকেজো করে দেওয়া হলো। প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলীকে গ্রেপ্তার করা হলো। এরই মধ্যে শুরু হলো চাপ—পরিবেশমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের পক্ষ থেকে এবং পরে ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদের হুমকি, চাপ ও রক্তচক্ষু।
ঘটনাস্থলে তার পক্ষ থেকে এক কর্নেল স্টাফকে পাঠানো হলো। অভিযান বন্ধের নির্দেশ এলো। কিন্তু আমি তাকে ফিরিয়ে দিলাম। অভিযান অব্যাহত রেখে পুরো প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে তা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনলাম।
ক্ষতিগ্রস্ত শত শত বাসিন্দাকে বলেছিলাম, “কোনো ভয় নেই, আমি পাশে আছি। অবৈধ আবাসন হবে না।”
এরপর চাপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে মন্ত্রী আমাকে সতর্ক করে বলেন, “জেনারেল মামুন টাকার বস্তাসহ আপনাকে গ্রেপ্তার করে মিডিয়ায় রিপোর্ট করবেন। অভিযান বন্ধ করুন। সেনাবাহিনী ক্ষেপে গেলে সরকারের টিকে থাকা দায় হবে।”
আমি জবাব দিয়েছিলাম, “স্যার, আপনি তো সরকারের মন্ত্রী—তাহলে ভয় কেন?”
সেই কর্নেল স্টাফ বারবার অনুরোধ করছিলেন যেন প্রকল্পের মালিকের কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু আমার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—পরিবেশ সুরক্ষা এবং দেশের স্বার্থ সবার ঊর্ধ্বে।
অবশেষে ‘আশিয়ান সিটি’র মালিককে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং তা আদায় করা হয়। এতে পরিবেশমন্ত্রী ও জেনারেল মামুন আরও ক্ষিপ্ত হন।
আমার বিশ্বাস—কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা চূড়ান্ত নয়; সর্বময় ক্ষমতা আল্লাহর।
সেই রাতেই আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। আমি তখন পরিবেশ ভবনেই রাতযাপন করতাম, সেখান থেকেই দিন-রাত সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করতাম। কিন্তু আমার কোনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ছিল না। এমনকি “বেলা” বা অন্য কোনো পরিবেশবাদী সংগঠনও সে সময় পাশে দাঁড়ায়নি।
আজ প্রশ্ন জাগে—কোথায় সেই জেনারেল মামুন খালেদ?
সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র যখন ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এ পরিণত হয়—এই ঘটনা তার একটি অনন্য উদাহরণ।
সরকারের কাছে আমার আহ্বান—সামরিক বাহিনীর আবাসন প্রকল্প ‘জলসিঁড়ি’ বাস্তবায়নে জেনারেল মামুন খালেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করা হোক। রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে পেশাদারিত্ব, সততা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় শাসনব্যবস্থার সংকট থেকেই যাবে।
তরুণ প্রজন্মের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলব—এসিআর অবমূল্যায়নের ভয়, পদোন্নতি বঞ্চনার আতঙ্ক কিংবা শাস্তিমূলক বদলির আশঙ্কায় কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পাবেন না। মনে রাখবেন, পার্থিব পদ-পদবী ও অর্থবিত্ত একসময় ভঙ্গুর ও শূন্য হয়ে যায়।
লেখক : সাবেক ডিরেক্টর (এনফোর্সমেন্ট), পরিবেশ অধিদপ্তর
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)



মন্তব্য করুন: