• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে চাই সুস্পষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ

মফিজুর রহমান

প্রকাশিত: ০৮:৪৫, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ০৮:৪৭, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে চাই সুস্পষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ

ছবি: মফিজুর রহমান

রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ সাশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বাংলাদেশে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। স্থান ও মৌসুমভেদে পার্থক্য থাকলেও দৈনিক গড়ে প্রায় ৪–৬ ঘণ্টা সমতুল্য পূর্ণ সূর্যালোকের ভিত্তিতে সোলার উৎপাদনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা যায়। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, গুদাম, বাণিজ্যিক ভবন, শপিং কমপ্লেক্স এবং বড় ছাদবিশিষ্ট স্থাপনাগুলোতে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।এই উদ্যোগ সফল হলে একদিকে বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ হ্রাস, জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

দেশের বিপুল সংখ্যক বাড়িঘর, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এসব ছাদ পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হলে নতুন জমি অধিগ্রহণ বা অতিরিক্ত ভূমি ব্যবহারের প্রয়োজন ছাড়াই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, সম্ভাবনাময় ভবন চিহ্নিতকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের উদ্যোগটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি যুগোপযোগী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০ এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে ৫,০০ মেগাওয়াটই আসার কথা রুফটপ সোলার থেকে। এই লক্ষ্য অর্জনে এবং গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে নেট-মিটারিং ব্যবস্থার অধীনে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ১০.৫০ টাকা মূল্য নির্ধারণের মতো আকর্ষণীয় প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।  

সোলার প্রকল্পের সাফল্য শুধু প্যানেল স্থাপন বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ কার্যকারিতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বজায় রাখা এবং বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত সুফল নিশ্চিত করা। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, বৈদ্যুতিক সংযোগ, মনিটরিং সিস্টেম ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির নিয়মিত পরীক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে, যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে এবং বিনিয়োগের প্রত্যাশিত রিটার্ন ব্যাহত হতে পারে। উন্নত দেশগুলোর অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, আমাদের সোলার খাতেও তেমন একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

অতীতে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে কেবল বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিশাল বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রুফটপ সোলার এই একমুখী নীতি থেকে সরে এসে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকেন্দ্রীকরণের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। দেশের হাজার হাজার কারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক ভবনের ছাদকে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো যায়, তবে সাধারণ গ্রাহকরা একাধারে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীতে পরিণত হবেন। ইতোমধ্যে ১০০০ বর্গফুটের বেশি ব্যবহারযোগ্য ছাদ রয়েছে এমন ভবনে নেট-মিটারিং পদ্ধতিতে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ভবনে ৮.৪২ মেগাওয়াটের সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন কিংবা জেলা প্রশাসকদের কার্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মতো উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, সঠিক তদারকি থাকলে এটি বড় আকারের সাশ্রয় এনে দিতে পারে।

রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে ভেন্ডর বা সরবরাহকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করতে হবে এবং কাজ সম্পন্ন করার পর চুক্তি অনুযায়ী দ্রুত ও নির্বিঘ্নে পেমেন্ট দিতে হবে। কারণ, ভেন্ডরদেরও যন্ত্রপাতি আমদানি, জনবল, স্থাপন, পরিচালন ব্যয় এবং বিনিয়োগের বিপরীতে আর্থিক দায়বদ্ধতা থাকে। পেমেন্ট দীর্ঘদিন আটকে থাকলে তাঁদের কার্যক্রম ব্যাহত হবে, নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা কমবে এবং পুরো উদ্যোগের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। তবে পেমেন্টের পাশাপাশি ভেন্ডরদের দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করতে হবে। চুক্তিতে নির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত ওয়ারেন্টি, সার্ভিস এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। বিশেষ করে ১০ বছরের সার্ভিস ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হলে তার আওতা, খরচ, শর্ত এবং প্রয়োগযোগ্যতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

রুফটপ সোলারের সফল সম্প্রসারণ দেশের শিল্পোৎপাদনে খরচ কমাবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে রাখবে। সরকারের এই সময়োপযোগী প্রণোদনাকে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তায় রূপান্তর করতে এখন প্রয়োজন নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন ও মাঠপর্যায়ের জটিলতা দূর করা।

সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানোর মধ্যে সীমিত নয়। এর ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতার চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ রয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। সরকার রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, নিঃসন্দেহে তা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।

সেন্টার ফর লিগ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক অ্যানালাইসিস -এর ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে বাংলাদেশে গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৭২২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। গত আট বছরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হয়েছে। একই গবেষণা অনুযায়ী, এ সময়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ এড়াতে সহায়তা করেছে। এসব হিসাব গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুতের সামগ্রিক প্রভাবের; শুধু রুফটপ সোলারের নয়।

বাংলাদেশের জন্য তাই সৌরবিদ্যুতের প্রসার শুধু বিকল্প বিদ্যুৎ তৈরির বিষয় নয়। এটি জ্বালানি আমদানির চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গেও যুক্ত। সরকারের ৪ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হলে রুফটপ সোলারের বাজারও বড় হতে পারে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন সহজ অর্থায়ন, কার্যকর নেট মিটারিং, মানসম্মত প্রযুক্তি এবং নীতির ধারাবাহিকতা।

আমার প্রত্যাশা, সরকার এই উদ্যোগকে শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করবে।

নীতিমালা হবে স্পষ্ট, অর্থায়ন হবে সহজবোধ্য, পেমেন্ট হবে সময়মতো, ভেন্ডরদের থাকবে ন্যায্য মুনাফা, আর রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবার ক্ষেত্রে থাকবে বাধ্যতামূলক জবাবদিহি।

সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, কার্যকর মনিটরিং এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে রুফটপ সোলার বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও টেকসই বিনিয়োগ খাতে পরিণত হতে পারে। সবুজ জ্বালানি শুধু ভবিষ্যতের প্রয়োজন নয়—এটি আজকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। গ্রিন এনার্জি হোক আমাদের এভারগ্রিন সম্ভাবনা।

লেখক : বাজার বিশ্লেষক ও অর্থ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গোল্ড বেল গ্রুপ।

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নেবে না।)

বিভি/এআই

মন্তব্য করুন: