• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লাজুক বালক থেকে রাজপথের সেনাপতি: রিজভীর ছেলেবেলা

শফিকুল ইসলাম বেবু

প্রকাশিত: ১৭:৪০, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
লাজুক বালক থেকে রাজপথের সেনাপতি: রিজভীর ছেলেবেলা

​মানুষের স্মৃতি জিনিসটা বড় অদ্ভুত। শৈশবের স্মৃতি তো আরও অদ্ভুত। বয়সের ভারে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি রয়ে যায় একদম স্পষ্ট—ঠিক যেন গতকালকের ঘটনা।

​১৯৬১ সালের ২ জানুয়ারি, হাড়কাঁপানো শীতের এক সোমবার। ঢাকার আকাশ কুয়াশায় ঢাকা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশটা মনে ধরল না আব্দুল কুদ্দুস সাহেবের। পুলিশের চাকরি করেন তিনি, নিয়ম-কানুন ও পরিবেশের বিষয়ে একটু খুঁতখুঁতে হওয়া স্বাভাবিক। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী জলিলা আখতারকে নিয়ে তিনি সোজা চলে এলেন তৎকালীন ঢাকার বিখ্যাত হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে।

পরপর তিনটি কন্যাসন্তান—মাহমুদা, মাহবুবা আর কামরুন্নাহার। আব্দুল কুদ্দুস-জলিলা আখতার দম্পতির বুকজুড়ে তখন এক গোপন প্রার্থনা, এবার যেন একটি পুত্রসন্তান হয়। সেই প্রার্থনার ফুল হয়েই জন্ম নিল এক ফুটফুটে শিশু। নাম রাখা হলো রুহুল কবির রিজভী।

বাবার চাকরির সুবাদে শিশু রিজভীর শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে বগুড়ায়। পড়াশোনার হাতেখড়িও বগুড়ার আদমদীঘি থানার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তবে ১৯৬৭ সালে রিজভীকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো বগুড়া শহরের মালতী নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীতে। সেখান থেকেই পঞ্চম শ্রেণী পাশ করে ভর্তি হলেন বিখ্যাত বগুড়া জেলা স্কুলে। এই মালতী নগর স্কুলেই একসময় পড়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না।

​ছেলেটি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে, তখনই ধেয়ে এলো ১৯৭১ সালের তপ্ত কালবোশেখী—আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। ​যুদ্ধ মানেই তো অনিশ্চয়তা, গৃহহীন হওয়া আর জীবন হাতে নিয়ে ছোটাছুটি। তিন বোন, ছোট বোন রোকেয়া, ছোট ভাই কামরুল হাসান—সব মিলিয়ে আটজনের প্রকাণ্ড সংসার নিয়ে বিপাকে পড়লেন আব্দুল কুদ্দুস সাহেব। বগুড়ার গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে কাটতে লাগল দিন। কষ্টের তীব্রতা যখন সহ্যের সীমা ছাড়াল, তখন রিজভীর বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন পৈত্রিক ভিটা কুড়িগ্রামে চলে যাওয়ার।

​রিজভীর দাদা কমর উদ্দিন পণ্ডিত ছিলেন একজন শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক। কুড়িগ্রাম শহরের সর্দার পাড়ায় তার একান্নবর্তী পরিবার। যুদ্ধের সেই ভয়াল দিনগুলোর মধ্যেই পরিবারটি পৌঁছাল সর্দার পাড়ায়। দেশ স্বাধীন হলে রিজভীর বাবা ঠিক করলেন, আর কোথাও যাবেন না, কুড়িগ্রামেই থিতু হবেন। রিজভীকে ভর্তি করে দেওয়া হলো কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীতে।

স্বাধীনতার পর পর কুড়িগ্রামের রূপ ছিল একেবারেই অন্যরকম। মহকুমা শহরটি সবেমাত্র পৌরসভা হয়েছে। রাস্তাঘাট বলতে বিশেষ কিছু নেই, চারদিকে একধরনের আদিম প্রশান্তি। বাড়ি থেকে রিজভীর স্কুলের দূরত্ব বড়জোর এক কিলোমিটার। কিন্তু সেই এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিযান!

​সর্দার পাড়ার ঘর থেকে বের হয়ে গাড়িয়াল পাড়া পার হয়ে, মহকুমা সদর হাসপাতালের পেছন দিয়ে, মস্ত ধানক্ষেতের আইল (সরু পথ) ধরে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। রিজভীর সঙ্গী ছিল তার দুই চাচাতো ভাই—রকেট আর সাকু। ওরা রিজভীর চেয়ে এক ক্লাস উপরে পড়ত। মাঝে মাঝেই বড় ভাই রকেটের বাইসাইকেলের পেছনে চেপে বসত লাজুক রিজভী।

বর্ষাকালে তৈরি হতো এক করুণ অথচ অনাবিল দৃশ্য। তিন ভাইয়ের জন্য ছাতা মাত্র একটি! মুষলধারে বৃষ্টি নামলে সেই একটি ছাতার নিচে তিন ভাই ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটত। জুতোয় কাদা ফুটত, জামার অর্ধেক ভিজে যেত, কিন্তু তিন জোড়া ছোট ছোট চোখে থাকত রঙিন স্বপ্নের বুদ্বুদ।

​ছোটবেলা থেকেই রিজভী ছিলেন শান্ত, ধীরস্থির আর প্রচণ্ড বইপ্রেমী। সহপাঠী জালাল হোসেন লাইজু (যিনি বর্তমানে ক্রীড়া সংগঠক) স্মৃতিচারণ করে বলেন, "রিজভী ক্লাসে ভীষণ লাজুক ছিল। কিন্তু পড়ালেখায় ছিল বেজায় মেধাবী।"

কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে রিজভীর চেয়ে এক ক্লাস উপরে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ত আজম নামের এক দূরন্ত ছেলে। এই আজম আর কেউ নন, আজকের প্রখ্যাত নাট্যাভিনেতা ও চিকিৎসক ডা. এজাজ! ডা. এজাজের বাবা মোঃ শাহ ইয়াছিন ছিলেন কুড়িগ্রাম পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট। তিনি শিশুদের ভীষণ ভালোবাসতেন এবং পরিচালনা করতেন 'অঙ্কূর কচি-কাঁচার মেলা'। বইপ্রেমী রিজভী ছিলেন এই কচি-কাঁচার মেলারই এক সক্রিয় সদস্য।

তবে স্কুলের দিনগুলো কেবল আনন্দেরই ছিল না, ছিল কড়া শাসনেরও। অনিল স্যার, প্রতাপ স্যার, খলিল স্যার কিংবা আজিজুল হক স্যারদের শাসনের কথা মনে পড়লে বুক এখনো কিছুটা দুরুদুরু করে ওঠে। সন্ধ্যার পর শিক্ষকদের ভয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়া ছিল একেবারে অসম্ভব। দ্রুত বদলি হয়ে যাওয়ার কারণে সামসুল হক, ফজলুর রহমান, মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার বা ছাকাওয়াতুল্লাহ সরকার স্যারদের মতো স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে রিজভীর খুব একটা সখ্য গড়ে উঠতে পারেনি।

​সপ্তম আর অষ্টম শ্রেণী পার হতেই আবার বাবার চাকরির বদলির বার্তা এলো। পরিবারটিকে আবার ফিরে যেতে হলো বগুড়ায়। ​কুড়িগ্রামের সেই সর্দার পাড়া, ধানক্ষেতের ভিজে যাওয়া সরু আইলপথ আর এক ছাতার নিচে তিন ভাইয়ের বৃষ্টির জল মেখে হেঁটে চলার শৈশবটা সেখানেই থমকে রইল।

সময় কত দ্রুত নদীটির মতো বয়ে যায়! সেই লাজুক, শান্ত ও বইয়ের পাতায় ডুব মেরে থাকা বালকটি কালক্রমে হয়ে উঠলেন দেশের রাজনীতির রাজপথের এক আপসহীন ও তীক্ষ্ণ বাকপটু ব্যক্তিত্ব—অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তবে কখনো নির্জন বর্ষণমুখর সন্ধ্যায়, হয়তো তাঁরও মনে পড়ে যায় একাত্‍তরের পরের সেই রূপালী কুড়িগ্রামের কথা—যেখানে একটা বাইসাইকেল ছিল, একটা ছাতা ছিল, আর ছিল কাদাঝরা ধানক্ষেতের এক মায়াবী আইলপথ।

লেখক - শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না)

বিভি/এমআর

মন্তব্য করুন: