• মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১ | ১৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৮

BVNEWS24 || বিভিনিউজ২৪

নন্দ ঘোষ-ইউক্যালিপ্টাস ও আমাদের দেখনদারি রক্ষণশীলতা 

রকিবুল হাসান

প্রকাশিত: ১৯:১৭, ২৮ অক্টোবর ২০২১

আপডেট: ১৯:৩০, ২৮ অক্টোবর ২০২১

ফন্ট সাইজ
নন্দ ঘোষ-ইউক্যালিপ্টাস ও আমাদের দেখনদারি রক্ষণশীলতা 

ইনসেটে রকিবুল হাসান, এই নিবন্ধের লেখক।

নন্দ ঘোষকে কখনো দেখিনি, কিন্তু জানি সব দোষ নন্দ ঘোষের! কিন্তু কেন? জানি না। জানতে চাইনি কখনো। আমি আপনাদের সংগে পরিচয় করিয়ে দেবো এমন এক নন্দ ঘোষকে; যাকে অনেকে ঠিকমতো চেনেন না। কিন্তু তার দোষ ধরতে খুব পারদর্শী। যে নন্দ ঘোষ-এর কথা বলছি, তার আরো একটি নাম আছে, তা হলো- ইউক্যালিপ্টাস। ইউক্যালিপ্টাস হলো দ্রুত বর্ধনশীল একটি উদ্ভিদ, যার আদি নিবাস অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। গাছটি বাংলাদেশে প্রবর্তন করা হয়েছে।

প্রখ্যাত বনবিদ সোমেশ্বর দাশ-এর বরাতে জানা যায়, ১৬২৯ সালেও শোভনবৃক্ষ হিসেবে, ১৯৩৮ সালে প্ল্যান্টেশন প্রজাতি হিসেবে এর উল্লেখ পাওয়া গেছে। গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইন্সটিটিউট ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে ইউক্যালিপ্টাস প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়। প্রসংগত, ইউক্যালিপ্টাস হলো এদেশে প্রবর্তিত অন্যতম প্রধান উদ্ভিদ প্রজাতি; যার প্রবর্তনের জন্য দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রায়োগিক গবেষণা করা হয়েছে। বন ও পরিবেশ সংরক্ষণে আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনে যতো দৈন্যই থাকুক না কেন, এই বিষয়ে আমাদের ব্যাপক আলোচনার আগ্রহ রয়েছে।

বন ও পরিবেশ সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা প্রত্যেকেই বীর, যারা রাস্তায় বুক ফুলিয়ে চিৎ হয়ে হাঁটি। [অনেকটা ভানু বন্দোপাধ্যায়-এর কৌতুকের মাস্তান ‘পাকিস্তানের’ মতো] গেলো গেলো রব তুলে পাড়া মাতাই। গুজবনির্ভর কথা-বার্তায় নিজের ধারণা তৈরি করি। ভুল ধারণায়, তথ্যগত অপর্যাপ্ততায়, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বুঝতে বা পর্যালোচনায় দেশ-কাল অর্থনীতি, বিজ্ঞানের উপযুক্ত প্রয়োগ বিবেচনায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করি। এই রকম রক্ষণশীল পরিবেশপ্রেমিক ও দরদীরাই দেশের জন্য কাতর হয়ে ইউক্যালিপ্টাসকে বাংলাদেশে নন্দ ঘোষ বানিয়েছেন।

বাংলাদেশে যেহেতু বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনা হয়নি, তাই মূলতঃ গণমতের ‘কান নিয়েছে চিলে’ বা Mob Psychology ভিত্তিক ধারণার কারণে বাংলাদেশ ইউক্যালিপ্টাস বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। পরে সঠিক জনমত সংগঠিত ও তৈরি হয়নি। ইউক্যালিপ্টাস বাংলাদেশে নন্দ ঘোষ হয়েই রয়ে গেছে। জনগণের মধ্যে ইউক্যালিপ্টাস বিষয়ক গুজবনির্ভর ধারণাটি থেকেই যাচ্ছে।

‘কান নিয়েছে চিলে’, বাংলাদেশে যে কয়টা এই প্রবাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ আছে, ইউক্যালিপ্টাস বিষয়ে দেশের জনগণের আচরণ এর মধ্যে অন্যতম হবে, নিশ্চিত। তাঁরা কম বুঝে, না বুঝেই, কিংবা গুজব শুনে, চেঁচিয়ে, সংবাদপত্র ও মিডিয়ায় খণ্ডিত ধারণা প্রচার করে বাংলাদেশে ইউক্যালিপ্টাসের প্রয়োগ ভীতিকর অবস্থানে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে যেহেতু বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনা হয়নি, তাই মূলতঃ গণমতের ‘কান নিয়েছে চিলে’ বা Mob Psychology ভিত্তিক ধারণার কারণে বাংলাদেশ ইউক্যালিপ্টাস বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। পরে সঠিক জনমত সংগঠিত ও তৈরি হয়নি। ইউক্যালিপ্টাস বাংলাদেশে নন্দ ঘোষ হয়েই রয়ে গেছে। জনগণের মধ্যে ইউক্যালিপ্টাস বিষয়ক গুজবনির্ভর ধারণাটি থেকেই যাচ্ছে।

বর্তমানে ইউক্যালিপ্টাস বিষয়ে গণ-ধারণাটি এমন যে, গাছটি বাংলাদেশে প্রবর্তন করে মস্ত অন্যায় করা হয়েছে। এই গাছ সব পানি শুষে নিচ্ছে, দেশকে মরুভূমি বানিয়ে দিচ্ছে, এর ডালে পাখি বসে না, পাতা বিষাক্ত- একে ঠেকাতে হবে। এই গণ-ধারণা ভুল। এটি যারা বুঝেন এবং জানেন, তাঁরা আলোর সামনে আসেন না, তাঁদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয় না। গণমত ভীতির কাছে কর্তাব্যক্তিদের বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাত্তা পায় না। বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ বন সংরক্ষণে ইউক্যালিপ্টাস প্রজাতিটির সম্ভাবনা ও সুযোগ আমাদের হাতছাড়া হয়।

ইউক্যালিপ্টাস খুব পানি শোষণ করে, এটি এই প্রজাতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত অভিযোগ। ইউক্যালিপ্টাস বেশি পানি টানে তো কী হয়েছে? আপনি কি ইউক্যালিপ্টাসে সেচ করে পানি দিয়েছেন? দেননি তো? তাহলে? এই আপনিই কিন্তু বোরো মৌসুমে ধানের জমিতে সেচের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চেঁচান। এক কেজি ধান তৈরি করতে কতো পানি দরকার, জানেন? কিন্তু তাবৎ রক্ষণশীল পরিবেশবাদী ভূ-গর্ভস্থ পানির এরকম লাগামছাড়া উত্তোলন নিয়ে কিছু বলেন না। কেননা ধান চাষকে নন্দ ঘোষ বলার মতো বুকের পাটা নেই।

ধান জলজ উদ্ভিদ নয়। ধান চাষের যে বিজ্ঞান ও এর যে সম্প্রসারণ কর্মসূচি তাতে ভালো ধান উৎপাদনের অন্যতম মূলমন্ত্র হলো ‘কম পানি বেশি কুশি’। এর মানে হলো জমিতে কম পানি ব্যবহার করলে একটা ধানের চারা থেকে অনেক ছড়া (tiller) গজাবে। ধানের এই কম পানি ব্যবহারের উপর ভিত্তি করেই পৃথিবীব্যাপী System of Rice Intensification (SRI) নামে এক ধরনের পদ্ধতি জনপ্রিয়; বাংলাদেশে এটিকে অনেকেই মাদাগাস্কার পদ্ধতি বলেন। পৃথিবীতে কম পানি ব্যবহারের এই পদ্ধতি জনপ্রিয় করেছেন আমেরিকান সমাজতত্ত্ববিদ প্রফেসর নরম্যান আপহফ, যিনি ২০০২ সালে আমার আমন্ত্রণে কেয়ার বাংলাদেশ (CARE Bangladesh) আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশ নিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি এটা স্পষ্ট করেছেন যে, ধান জলজ উদ্ভিদ (aquatic plant) নয়, পানিতে বেশিদিন থাকলে এর শেকড় পচে যায়, ভালো ধান চাষের জন্য পালাক্রমে সেচ ও জমি শুকানো দরকার। যাক, ধান ভানতে শিবের গীত আর না গাই।

এক কেজি ধান তৈরি করতে কতো পানি দরকার, জানেন? কিন্তু তাবৎ রক্ষণশীল পরিবেশবাদী ভূ-গর্ভস্থ পানির এরকম লাগামছাড়া উত্তোলন নিয়ে কিছু বলেন না। কেননা ধান চাষকে নন্দ ঘোষ বলার মতো বুকের পাটা নেই।

পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধান খুব পারঙ্গম (efficient) নয়, সেই তুলনায় ইউক্যালিপ্টাসের পানি ব্যবহার সক্ষমতা (water use efficiency) বেশি। এটি তার দ্রুত বায়োমাস তৈরিতে কাজে লাগে। বাকি পানি প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বায়ুমন্ডলেই ফিরে যায়, পানিচক্রে ভূমিকা রাখে। ইউক্যালিপ্টাস বড়জোর ৭-৮ ফুট নিচের পানি টেনে আনতে পারে। ধানের জন্য আমরা ২০০-৪০০ ফুট নিচের পানিই তুলে আনি। তবু দেখুন, ধান ক্ষেত পানিতে ডুবিয়ে না রাখলে কৃষকের শান্তি নেই। যদিও কৃষি দপ্তর এখন কৃষক পর্যায়ে পানি সাশ্রয়ী চাষ পদ্ধতি প্রচলনের চেষ্টা করছে, তবু খাদ্য নিরাপত্তার অজুহাতে ভূ-গর্ভস্থ পানি টানার মহোৎসবে সায় থাকে সবার। মরুকরণসহ দেশের সব পানি শেষ করার অপবাদ জোটে নন্দ ঘোষ ইউক্যালিপ্টাসের কপালে। অথচ দেখুন, দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ প্রতিরোধ করতে যেসব বৃক্ষের প্রজাতি রোপণ করা হয়েছে, তার মধ্যে ইউক্যালিপ্টাস অন্যতম।

আসুন, ফের শুরু করা যাক, ইউক্যালিপ্টাস নিয়ে আলোচনা। খানিক আগে বলেছিলাম, গণমত-ভীতির কাছে পরাস্ত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশে ইউক্যালিপ্টাসের ভবিষ্যত! আমরা বাংলাদেশে ইউক্যালিপ্টাসের সঠিক ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছি! গণমতকে খুব একটা পাত্তা দিতে নেই। গণমতের কোনো প্রায়োগিক মূল্য নেই। গণ (Crowd) যখন অ-সংগঠিত, তখন অসচেতনভাবে, না বুঝে, হুজুগে কথা বলে। গণের সংগে ব্যক্তির মত ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য থাকে।

“হুজুগে বাঙালি” শব্দটি এই সাইকোলজিকে দারুণভাবে ধারণ করে। হুজুগে বাঙালি কী কী করতে পারে, আমরা বহুবার, বারবার দেখেছি। গণ-এর মতকে পাত্তা দিতে হয় না, তা পশ্চিমবঙ্গের লেখক-গায়ক-গীতিকার-বিতার্কিক চন্দ্রিল ভট্টাচার্য চমৎকারভাবে প্রমাণ করেছেন এক সরস বিতর্কে। তিনি উদাহরণ টেনে বলেছেন “গণ-মানুষ দল বেঁধে সত্যজিতের ছবি দেখে, আবার বেদের মেয়ে জোসনাও দেখতে যায়। তাই বলে দু’টো ছবিকে এক পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই। গণমানুষ ভোট দিতে গেলে সবাই হয়তো জীবিত বাঙালিদের মধ্যে অমর্ত্য সেনকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচন করবেন এবং তাদের অধিকাংশই করবেন অমর্ত্য সেন সম্পর্কে কিছু না জেনেই, তার কোনো লেখা না পড়েই!”

এসব বুদ্ধিমান লোক ভেবে দেখেন না, তাঁর আশেপাশে কয়টা দেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে? আম, কাঁঠাল, মেহগনি, শিশু, কমলা, মোসাম্বি; যা দেখবেন প্রায় সবই বিদেশি গাছ। দোষ শুধু ইউক্যালিপ্টাসের। কেননা সে খুব পানি শুষে নেয়! 

গণ মানুষের পাগলামি ঠেকানোর বুদ্ধি কী? একটাই। পাগলামি ঠেকাতে প্রতিবাদ করতে হয়, প্রশ্ন করতে হয়! পাগল প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না! প্রশ্ন করলে পাগলামি সারে। এই বিষয়ক একটা মজার গল্প করতে ইচ্ছা করছে। আমরা যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়তাম, তখন একটা তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কাছে টাকা চেয়ে বেড়াতো, বিশেষত প্রেমিক-জুটির কাছে। এসে বলতো, মামু একগ্যা টেহা! টাকা না দেওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই। একটাই উপায় ছিলো, পাল্টা প্রশ্ন করা। তাকে যদি বলা হতো, মামু এওকগ্যা টেহা! সে ‘হেই কাম নাই, হেই কাম নাই’ বলতে বলতে পালাতো। 

আমাদের দেশে অন্তত কয়েক কোটি মানুষ পাওয়া যাবে, যারা মনে করেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করেই সন্ত্রাস, মাদক দূর করতে হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় কে কীভাবে এলো, এটা তাঁদের মাথা ব্যথা নয়। তিনি বা তাঁরা সুখে থাকতে চান। সব সময় নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন, বোধ কাজ করে না, কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করেন না, চিন্তা করেন না, নিজের ভালোটাই তাঁর বা তাঁদের মাথায় ঘুরপাক খায়। তিনি বা তাঁরা শুধু ঝাঁপ দেন। গুজবে, গণ পিটুনিতে, না বুঝেই শেয়ারবাজারে।

ইউক্যালিপ্টাসের বাংলাদেশে প্রয়োগ অনেকটাই মব সাইকোলজি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। গড়ন বা Crowd Psychology-এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অনেক লোক একসংগে একটা ভুল বা অন্যায় কাজের পেছনে ছোটেন। মাথা ঠিক থাকে না। ব্যক্তিগত উপলব্ধি, অভিজ্ঞতার ভিন্নতা থাকলেও দলের সংগে জুটে যান বাজে কাজ করতে। সম্প্রতি ছেলেধরা গুজবে প্রথম যে রিতুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো সেই নিরীহ কিশোর একজন সবজি বিক্রেতা। অনেক শিক্ষিত মানুষও এই মব সাইকোলজির কারণে বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে অপ-চিন্তা করেন। ওহ, সবাই যখন ইউক্যালিপ্টাসকে খারাপ বলছে, তাহলে নিশ্চয়ই খারাপ। ওর থেকে খারাপ গাছ আর হয় না! দেশটা শেষ করে দিচ্ছে বন বিভাগ, বিদেশি প্রজাতির গাছ এনে!

এসব বুদ্ধিমান লোক ভেবে দেখেন না, তাঁর আশেপাশে কয়টা দেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে? আম, কাঁঠাল, মেহগনি, শিশু, কমলা, মোসাম্বি; যা দেখবেন প্রায় সবই বিদেশি গাছ। দোষ শুধু ইউক্যালিপ্টাসের। কেননা সে খুব পানি শুষে নেয়! 

আমি বলতে চেয়েছিলাম, ইউক্যালিপ্টাসের ভালো গুণগুলোর কথা! যে অঞ্চলে বার্ষিক গড়বৃষ্টি ৪০০ মিলিমিটারের কম, সেখানে ইউক্যালিপ্টাস লাগানো উচিত নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত কতো? বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কোথায়? প্রাকৃতিকভাবে ইউক্যালিপ্টাস ক্যামালডুলানসিস পাওয়া যায় যে অঞ্চলে, সেখানকার বৃষ্টিপাতের বার্ষিক মাত্রা ২৫০ থেকে ৬০০, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ১২৫০ মিলিমিটার এবং সর্বনিম্ন ১৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত! অন্য প্রজাতির ইউক্যালিপ্টাসের ক্ষেত্রে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের সীমা ৬০০-৩০০০ মিলিমিটার। সাধারণভাবে বলা যায়, ইউক্যালিপ্টাস বেশ সহনশীল উদ্ভিদ। এটি খরা থেকে শুরু করে অতি বৃষ্টিপাত, সব সহ্য করতে পারে।

চলুন আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত হচ্ছে ১৮৭৫ মিলিমিটার। বাংলাদেশ একটি দারুণ সতেজ সমতল এলাকা (Active Flood Plain)। এই এলাকার অন্তত ২৫-৫০ ভাগ পার্শ্ববর্তী উঁচু দেশগুলো থেকে গঙ্গা-যমুনা-সুরমা-কুশিয়ারা এই চার নদীর বয়ে আনা পানিতে মে-সেপ্টেম্বর সময়ে পানিতে তলিয়ে থাকে। এরকম পানিতে ডোবা দেশে ইউক্যালিপ্টাস পানি খেয়ে ফেলছে অভিযোগে তাকে ত্যাজ্য করা হয়! অথচ ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগের জলাধার যেমন খাল-বিল-নদী, অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট তৈরিসহ দখলের জন্য ভরাট ইত্যাদি বিষয়ে তাবৎ পরিবেশবাদীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুপ মেরে থাকেন।

যারা গৃহস্থালির জ্বালানির জন্য বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসের উপর নির্ভরশীল, যারা আমদানিকৃত চকচকে কাঠের খাটে ঘুমান, তাঁরা কেমন করে বুঝবেন- কেন, কোন্ প্রয়োজনে সরকার এদেশে আকাশমনি’র মতো ফালতু গাছ আয়োজন করে প্রবর্তন করেছে?

সম্প্রতি প্রবর্তিত অন্য আরেকটি প্রজাতি আকাশমনি (Acacia auriquliformis) নিয়েও বেশ অপপ্রচার চলছে। বলা হচ্ছে, আকাশমনি’র পরাগরেণু বাতাসে ছড়াচ্ছে, অনেক রোগ-ব্যাধি হচ্ছে। এটা ফালতু গাছ, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর কী! কাটো আকাশমনি! এমনটি করেন কিছু শৌখিন, অতি রক্ষণশীল পরিবেশবাদী; যারা ব্যক্তিজীবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রচ্ছদের বাইরে গিয়েছেন কি না আমার সন্দেহ আছে! সরকারি কিছু দপ্তরের গাছও এমন অন্যায় অজুহাতে কাটা হয়েছে!

আমি উদ্ভিদবিদ নই। কিন্তু জানি, আকাশমনি (Acacia) উভলিঙ্গ (hermaphrodite)। বাতাসের মাধ্যমে এর পরাগায়ন ঘটে না। এদের পরাগরেণু আঠালো। পরাগায়নের জন্য এদের উপকারী পোকাদের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। তাই এই প্রজাতির ফুলের রঙ উজ্জ্বল হলুদ, যেন পোকারা আকৃষ্ট হয়ে কাছে আসে। এই তথ্যগুলো জানা নেই বলে অপ-প্রচারের দাঁতভাঙা জাবাব দিতে পারেন না অনেকে। ঢাকা বিভাগের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে আকাশমনি প্রজাতি ব্যবহার করে সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে। কতোজন পরাগরেণুর আক্রমণে হাসপাতালে গেছেন? যারা গৃহস্থালির জ্বালানির জন্য বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসের উপর নির্ভরশীল, যারা আমদানিকৃত চকচকে কাঠের খাটে ঘুমান, তাঁরা কেমন করে বুঝবেন- কেন, কোন্ প্রয়োজনে সরকার এদেশে আকাশমনি’র মতো ফালতু গাছ আয়োজন করে প্রবর্তন করেছে?

আকাশমনি’র ফুল

ইউক্যালিপ্টাস ও আকাশমনিসহ দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতিসমূহের বিরুদ্ধে বিষোদগার যারা করেন, তাঁরা জানেন না, এখনো বাংলাদেশের গৃহস্থালি জ্বালানির অন্তত ৭০ ভাগেরও অধিক যোগান আসে বায়োমাসভিত্তিক জ্বালানি থেকে! যেখানে গত ২০ বছর ধরে আকাশমনিসহ অন্য দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতির ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে! হুজুগে পরিবেশবাদীরা জানেন না, আমাদের দেশের গোলকাঠের (round wood) ৮ মিলিয়ন কিউবিক মিটারের মতো সাপ্লাই-গ্যাপ আছে। আমদানি করে ৩ মিলিয়ন কিউবিক মিটার কাঠ আনা হলেও প্রায় ৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটারের ঘাটতি থেকেই যায়। ভবিষ্যতে এটা আরো বাড়বে। বনের বাইরে এবং বনের মধ্যে দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতি রোপন এবং পরিচর্যা করেই এই ঘাটতি মেটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রসংগত উল্লেখ করা যায়, সরকারের প্রাকৃতিক বন থেকে গাছ সংগ্রহ ১৯৮৫ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। সমতল ভূমির সামাজিক বনায়নসহ পাহাড়ের যেসব বনায়ন কর্মসূচি থেকে কাঠ আহরণ করা হচ্ছে, তার ব্যাপক অংশই যোগান দেয় আকাশমনি!

আমি নিজে আকাশমনির এমন ঢালাও ব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলতে অভ্যস্ত। তবু আমার পক্ষেও অস্বীকার করার জো নেই, বাংলাদেশের বনজ সম্পদ রক্ষায় আকাশমনি ও উত্তরাঞ্চলে কৃষকদের লাগানো ইউক্যালিপ্টাসের একটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সুন্দরবনসহ দেশের অন্য বনাঞ্চলের ব্যাপক অংশ রক্ষিত এলাকা (Protected area) হিসেবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এই ধরনের বন এলাকায় সংরক্ষণই প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, উৎপাদনশীলতা নয়। Aichi Biodiversirty Targets I Sustainable Development Goals (SDG)-এর প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে প্রটেক্টেড এরিয়ার পরিমাণ আমাদের আরো বাড়াতে হবে!

এখন অবধি সমতলের সামাজিক বনের এলাকা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপকভিত্তিক উৎপাদনশীল বন আমরা তৈরি করতে পারিনি। উল্লেখ্য, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী মেনিফেস্টো’র কথায়ও উৎপাদনশীল বনের উল্লেখ রয়েছে। 

বন খাতকে যথেষ্ট উৎপাদনশীল করতে আমরা ব্যর্থ। অথচ কৃষিসংশ্লিষ্ট অন্য খাত, যেমন- মৎস্য এবং পশুসম্পদ খাতেই প্রজাতি বৈচিত্র্য ধরে রাখতে এবং দেশের মৎস্য ও পশুসম্পদের চাহিদা মেটাতে ব্যাপকভিত্তিক বিদেশি প্রজাতির প্রচলন করা হয়েছে। যেহেতু আমাদের খেয়ে-পরে বাঁচতে হয়, সেহেতু আমরা সেই জায়গাগুলোতে জাত গেলো, জাত গেলো, আমাদের সব গেলো, পরিবেশ শেষ বলে আমরা চেঁচাই না।

বন খাতকে যথেষ্ট উৎপাদনশীল করতে আমরা ব্যর্থ। অথচ কৃষিসংশ্লিষ্ট অন্য খাত, যেমন- মৎস্য এবং পশুসম্পদ খাতেই প্রজাতি বৈচিত্র্য ধরে রাখতে এবং দেশের মৎস্য ও পশুসম্পদের চাহিদা মেটাতে ব্যাপকভিত্তিক বিদেশি প্রজাতির প্রচলন করা হয়েছে। যেহেতু আমাদের খেয়ে-পরে বাঁচতে হয়, সেহেতু আমরা সেই জায়গাগুলোতে জাত গেলো, জাত গেলো, আমাদের সব গেলো, পরিবেশ শেষ বলে আমরা চেঁচাই না। দিব্যি ব্রয়লার মুরগি, থাই কই কিংবা বিদেশি জাতের গরুর মাংস, বিটি বেগুন, হাইব্রিড জাতের ধান থেকে তৈরি চালের ভাত হজম করি, তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলতে শুরু করি- গেলো, আমাদের পরিবেশ গেলো, ইউক্যালিপ্টাস এসেছে, আমাদের জীববৈচিত্র্য গেলো!

একই রকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের চিন্তার এই দ্বৈত অবস্থান নিয়ে কেউ কখনও ভাবি না! ভাবুন তো, কী কী মাছ এসেছে এদেশে, যে মাছগুলো দেশি প্রজাতির নয়? আমরা এগুলো হরদম দেখলেও ব্যাপক গণভিত্তিক হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীদের মতো চেঁচামেচি করছি না। করছি না, কেননা আমাদের ভেতর খাদ্য নিরাপত্তার চিন্তাটা সহজেই এসে পড়ে। কাঠের চাহিদার কথা কারো মাথায় সহজে আসবেই না। আসবে? আসেনি।

শুধু কাঠের চাহিদা নয়; আসেনি বনের প্রতিবেশগত সেবা ও বন্যপ্রাণের বিবেচনাও। সেজন্যই আমাদের বন ও বনজ সম্পদের প্রতি একরকম উদাসীনতা রয়ে যাচ্ছে সিদ্ধান্তগ্রহণ, প্রয়োগ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে। বিগত ৫০ বছরে বনবিভাগ উপক‚লের নতুন চর বনায়ন করে নতুন করে দেশের মূল ভূ-খন্ডের সংগে যুক্ত করেছে প্রায় চার লাখ একর জমি। যার প্রায় এক লাখ একর ভূমি, ভূমি মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষি বা অন্য ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে; কিছু অংশ রিজার্ভ বন হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে। একইসংগে সরকারি বন-ভূমির হিসাব থেকে বেশ বড় একটা অংশ, প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার একর বনভূমি, বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণে বরাদ্দ করতে হয়েছে। সেই সংগে বনের উপর আছে স্থানীয় জনসাধারণের জ্বালানি সংগ্রহ, বনজ সম্পদের অবৈধ কর্তন ও অবৈধ জবর-দখল প্রচেষ্টা।

আমরা যদি বন রক্ষা করতে চাই তবে জ্বালানি, কাঠ ও বনের সেবাগুলোর প্রবহমানতা বজায় রাখতে হবে। প্রতিবছর অন্তত ৯,০০০ হেক্টরের বেশি বনায়ন করতে হবে এবং তা টিকিয়েও রাখতে হবে। একইসংগে ইতিমধ্যে অবক্ষয়িত অন্তত ৬ লাখ হেক্টর বন পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। এসবের জন্য বনে ও বনের বাইরে দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতি যেমন দরকার, তেমনি দরকার বনভূমি রক্ষার জন্য শক্তিশালী আইন, আইন বাস্তবায়নের জন্য জনবল সমৃদ্ধ বনবিভাগ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বনের চারধারে দেয়াল দেওয়া নেই। ফলে আইনগত প্রবেশযোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যবহারকারী বনে প্রবেশ করছেন। প্রতি বন-বিটে মাত্র ৩-৪ জন বনকর্মী থাকেন, যাদের উপর থাকে ২০০০-১০০০০ একর বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব। [তুলনা করার জন্য জানিয়ে রাখি, মাধবপুর চা বাগান; যা এশিয়ার অন্যতম একটি বড় চা বগান, এর আয়তন প্রায় ৪,০০০ একর, প্রতিদিন ২,২০০ শ্রমিক কাজ করেন। এর অনেক অংশেই সীমানা চিহ্নিতকরণের জন্য অন্তত কাঁটাতারের বেড়া খুঁজে পাওয়া যাবে] তাই জনসাধারণের আইন মেনে চলার মানসিকতা ও সহযোগিতা ছাড়া বন রক্ষা করা কঠিন। প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে প্রায় ৯,০০০ হেক্টর বন বিনাশ হয়।

আমরা যদি বন রক্ষা করতে চাই তবে জ্বালানি, কাঠ ও বনের সেবাগুলোর প্রবহমানতা বজায় রাখতে হবে। প্রতিবছর অন্তত ৯,০০০ হেক্টরের বেশি বনায়ন করতে হবে এবং তা টিকিয়েও রাখতে হবে। একইসংগে ইতিমধ্যে অবক্ষয়িত অন্তত ৬ লাখ হেক্টর বন পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। এসবের জন্য বনে ও বনের বাইরে দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতি যেমন দরকার, তেমনি দরকার বনভূমি রক্ষার জন্য শক্তিশালী আইন, আইন বাস্তবায়নের জন্য জনবল সমৃদ্ধ বনবিভাগ।

এছাড়া বনের ভেতরে আমাদের স্থানীয় প্রজাতির গাছ সুরক্ষায়, যতোদিন পর্যন্ত না নতুন উন্নত দেশি দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ প্রজাতি চিহ্নিত না হচ্ছে, ততোদিন বনের বাইরে ইউক্যালিপ্টাস বা আকশমনি’র মতো অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিদেশি প্রজাতির উদ্ভিদ লাগানোর কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে নেই। উপযুক্ত বিকল্প নির্দেশ না করে দেখনদারি, রক্ষণশীলতা প্রদর্শন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কোনো সুবিবেচনা তৈরি করবে না। অধিকন্তু, বিলীয়মান দেশীয় প্রজাতিগুলোকে প্রাকৃতিক পরিবেশে আরো বিপন্ন করবে।

লেখকঃ নির্বাহী পরিচালক, আরণ্যক ফাউন্ডেশন।

[এই লেখা নিয়ে কারো ভিন্নমত থাকলে, লেখক তা জানতে আগ্রহী। বিভিনিউজ২৪-ও ভিন্নমতকে স্বাগত জানায়। তবে এই সংক্রান্ত ব্যাখ্যা বা আলোচনা অবশ্যই যৌক্তিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে।]

বিভি/এসডি

মন্তব্য করুন: