• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২ | ১৬ আষাঢ় ১৪২৯

এই শহরে এমন লোকও আছে!

মুরসালিন নোমানী

প্রকাশিত: ১৯:৫৭, ২৩ জুন ২০২২

ফন্ট সাইজ
এই শহরে এমন লোকও আছে!

বন্ধুরা একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য আজকের এই লেখা। গতকাল রাতে অফিস থেকে বের হয়ে কাকরাইলে একটি কাজে এক বন্ধুর অফিসে গিয়েছিলাম। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কাজ শেষ করে বন্ধুর অফিস থেকে বের হই। পরে কাকরাইল মোড় থেকে বের হয়ে শান্তিবাগে আমাকে বাসায় নিয়ে যাবেন কীনা তা একজন রিকসা চালককে জিজ্ঞাসা করলাম। 

মধ্য বয়সি রিকসা চালক বললেন, ‘আমাকে খাওয়ালে আমি যাব।’ তিনি একথা বলতে বলতে আমি তাকে অতিক্রম করে সামনে এগুতে থাকি। কয়েক কদম হেটে যাওয়ার পর আমার কাছে  কেমন  যেন মনে হলো, আবার সেই ভদ্র লোকের কাছে ফিরে এসে আমি বললাম, ‘আচ্ছা আপনি চলেন, আপনাকে খাওয়াবো।’ 

রিকসায় উঠার পর উনি কান্না শুরু করলেন। যা জানতে পারলাম, তা হলো- এই রিকসা চালক ভদ্রলোক দুই ব্যক্তিকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে লালবাগে নিয়ে যান। সেখান থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ওই দুই ব্যক্তি রিকশা চালককে নিয়ে যান। তারা রিকসা চালককে বলেন, শেষ গন্তব্যে গিয়ে ভাড়া দিবেন। তিন ঘন্টার বেশি সময় তিনি তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গেছেন। কাকরাইল ব্যাটারির গলিতে এসে রিকসা থামিয়ে দুই জনই একটি গলির মধ্যে ঢুকে পড়ে। বলে যান, বাসা থেকে টাকা এনে উনাকে তার পাওনা ৩৬০ টাকা দিয়ে যাবেন। তিনি ওই ব্যাটারির গলিতে প্রায় এক ঘন্টা অপেক্ষার পরও তারা আর ফিরে আসেনি। পরে রিকসা চালক সেখানে দাড়িয়ে কান্না করতে থাকেন। তার পরের যাত্রী হলাম আমি। রিকসা চালাতে চালাতে তিনি আবারও কান্না শুরু করলেন। কিন্তু আমার কাছে তখন মনে হলো, এই নগরীতে এমন খারাপ লোকও আছে যারা হতদরিদ্র রিকসা চালককেও ঠকান। 

মালিবাগ মোড় থেকে শান্তিবাগের রাস্তা পুনঃনির্মাণের কাজ চলায় উনাকে মালিবাগ মোড়ে থামতে বলি। মালিবাগ মোড়ে দাড়িয়ে উনাকে রাস্তার ধারে থাকা একটি হোটেলে খাওয়ার অনুরোধ করি। সেখানে শুধু পরাটার ব্যবস্থা থাকায় তিনি খেতে রাজি হলেন না। এরপর আমি উনার কাছে জানতে চাইলাম, মৌচাক মোড় থেকে একটু ভিতর দিয়ে ঘুরে আমার বাসা শান্তিবাগে যাবেন কিনা, আর গেলে বাসায় খাবার ব্যবস্থা করবো। তিনি রাজি হলেন। বাসায় নিয়ে গিয়ে যাই ছিল তা উনাকে খেতে দেওয়া হলো। 

খেতে খেতে তিনি আবারও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে কাদতে বললেন ওই দুই ব্যক্তির বহনকালে দীর্ঘসময় ৪ ঘন্টা তিনি কিছু খাননি। খুব ক্ষুধা পেয়েছেন। তিনি যখন খাচ্ছিলেন টেবিলে বসে তার মুখে তৃপ্তির ছাপ দেখছিলাম। 

কথায় কথায় জানালেন, তার গ্রামের বাড়ি শেরপুর। এবারকার বন্যায় তাদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে তিনিসহ ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে ঢাকায় এসে রিকসা চালাচ্ছেন। থাকছেন মান্ডা ব্রিজের কাছে। বাসায় টাকা নিয়ে গেলে খাবার কিনে বৃদ্ধা মাসহ স্ত্রী সন্তানদের খাওয়ার ব্যবস্থা হবে। আমি তাকে বিষয়টি ভুলে যাওয়ার অনুরোধ করি। কিন্তু দরিদ্র ওই ব্যক্তি যে কষ্ট পেয়েছেন, এমন কষ্ট যেন আমরা কাউকে না দিই। 

খাবার পর বাসা থেকে উনার ও পরিবারের জন্য কিছু কাপড় চোপড় দিলেন আমার স্ত্রী। বিদায় বেলায় সামান্য কিছু টাকা দিলাম। তিনি বিদায় বেলায় বলে গেলেন, স্যার আজ আর রিকসা চালাবো না, বাসায় গেলেই অন্যদের খাবারের ব্যবস্থা হবে।

লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’র (বাসস) জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এবং সাবেক সভাপতি-ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: