• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

অটিজম: উপেক্ষা বা অবজ্ঞা নয়, চাই যত্ন

মফিজুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১৬:৩৯, ২ এপ্রিল ২০২৪

আপডেট: ১৫:৪৮, ৪ এপ্রিল ২০২৪

ফন্ট সাইজ
অটিজম: উপেক্ষা বা অবজ্ঞা নয়, চাই যত্ন

চোখ দুটো বন্ধ করে কল্পনা করুন। প্রবাসে, অন্ধকার রাতে, একটা অজানা শহরের জনবহুল সড়কের পাশে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। চারিদিকে যানবাহনের শব্দ। আশপাশের কারও কথা আপনি বুঝতে পারছেন না। দু একটা শব্দ বুঝলেও আপনার চারিদিকের পরিস্থিতি বোধগম্য করতে পারছেন না। নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে চাইছেন , তাও পারছেন না। এটি একটি অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর দৈনন্দিন অনুভব এবং এ নিয়ে তাদের জীবন চলমান।

আবার কল্পনা করুন। আপনার ৫ টা ইন্দ্রিয়ই ওলটপালট হয়ে গেছে। যে কোন শব্দই আপনার কানে উচুঁ ভলিউমের মিউজিকের মত শোনাচ্ছে। আপনার বেডরুমের লাইটটা হাই পাওয়ার সার্চ লাইটের মতো চোখে পীড়া দিচ্ছে। আপনার পরনের কাপড়টা গায়ে স্পর্শ করলেই শিরিষ কাগজের মতো খসখসে লাগছে। একটা সেনসরি সমস্যাগ্রস্ত অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর প্রতিদিনকার অনুভূতি এটি।

রহস্যাবৃত অটিজম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ অটোস থেকে । যার অর্থ সেলফ, বাংলায় স্বয়ং বা
স্বীয়। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিও ক্যানার সর্বপ্রথম বিশেষ ধরনের মনস্তাত্বিক সমস্যায় আক্রান্ত কিছু শিশুর মধ্যে এই রোগটি সনাক্ত করে অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন। নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকার প্রবণতার কারনেই রোগের এই নামকরণ । প্রথম দিকে অটিজমকে স্কিজোফ্রেনিয়া বলে ভুল করা হতো। 

অটিজম শব্দটির সাথে পরিচিত জনসাধারণ নেই বললেই চলে। এমনকি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদেরও অটিজম সম্পর্কে জ্ঞান সীমাবদ্ধ। অটিজম মস্তিষ্কে বিকাশের এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা যা শিশুর জন্মের প্রথম ৩ বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়/দেখা দেয়। অটিজমকে নিউরোবায়োলজিক্যাল ডিজঅর্ডার বলা হয়।

অটিজমের ৩ টি প্রধান সমস্যা হচ্ছেঃ
১. মৌখিক ও অমৌখিক যোগাযোগে সমস্যা
২. সামাজিকতার সমস্যা
৩. সীমাবদ্ধ বা পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ ও আগ্রহ

প্রায় অর্ধেক অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু কথা বলতে পারে না, পারলেও ঠিকমত মনের ভাব প্রকাশ বা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা। আবার অনেক ক্ষেত্রে ইশারা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও যোগাযোগ করে না। সঠিকভাবে ভাষা প্রয়োগ, নিজের অনুভূতি , চিন্তা বা চহিদা প্রকাশ করতে পারেনা। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলতে আগ্রহ দেখায়। ঠাট্রা বা
বাগধারা বোঝে না। সামাজিক আদান-প্রদান করতে চাইলেও কিভাবে করতে হবে বুঝে উঠতে পারে না। কিছু কিছু শিশু সামাজিক হলেও তাদের কথোপকথন স্বাভাবিক হয় না ও বেশিক্ষন চালিয়ে যেতে পারেনা। সমাজে বা পরিবেশ এডজাস্ট করা তাদের জন্য কঠিন হয়। অন্যদের সাথে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক স্থাপন, আদান প্রদান মূলক খেলা, চোখে চোখে তাকানো, সামাজিক হাসি বিনিময় এসবে তাদের সমস্যা থাকে।
একই কাজ বার বার করার, একা কথা বার বার বলার প্রবণতা থাকে। তারা অন্যের অনুভূতি বা চেহারার অভিব্যক্তিও অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে অক্ষম। এই শিশুরা কি শোনে, দেখে, অনুভব করে তা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। স্বাভাবিক যোগাযোগ পন্থা, সামাজিকতা, এমন কি সাধারণ খেলাও হাতে ধরে শিখাতে হয়। অনেকে এদের সুন্দর স্বাভাবিক চেহারা দেখে মনে করেন ওরা ইচ্ছাকৃত ভাবেই কথা বলে না বা অন্যের কথা শোনে না। এই ধারণাটা ভুল। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা স্বাভাবিক নিয়মে যোগাযোগ, সামাজিক বা আচরণ করতে চাইলেও
পারেনা । দৈনন্দিন সাধারণ বিষয়গুলো অনুধাবন করতেও এরা ব্যর্থ।

অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডারঃ অটিজমকে অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার বলা হয় কারন এর বিস্তৃতি ব্যাপক। এই স্পেক্ট্রাম
অতি মাত্রায় সমস্যাগ্রস্থ, স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন, মানসিক প্রতিবন্ধিতাসহ উচ্চ মেধা সম্পন্ন আত্মনির্ভরশীল কিন্তু সামাজিকতায় পেছানোদেরকেও ফেলা হয় অটিজম কোন মানসিক রোগ নয়।

অন্যান্য সমস্যাঃ
অটিজম আক্রান্ত শিশুর অনেক ক্ষেত্রে সেনসরি সমস্যা অর্থাৎ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সমস্যা থাকতে পারে। দেখা, শোনা, স্পর্শ, ঘ্রান ও স্বাদ- এই গুলোর যে কোন একটি বা একাধিক বিষয়ে সংবেদনশীল হতে পারে। কোন কোন বিশেষ শব্দ, রং, ঘ্রান সহ্য করতে পারে না। কোলে ওঠা পছন্দ করে না, আবার সব কিছু মুখে দেয়, চিবায়। নিজের মুখে বা আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করে। অনেকের এপিলেপসি,
এ্যাংজাইটি, ফোবিয়া বা ডিপ্রেশন ও থাকতে পারে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুদের আনইভেন স্কিল ডেভেলপমেন্ট হয়ে থাকে। অর্থাৎ কোন
কোন ক্ষেত্রে খুব দুর্বল আবার কোন কোন ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ হতে পারে। প্রায় ১০ ভাগ শিশু গণিত, ছবি আঁকা, সঙ্গীত, পাজেল মিলানো, কম্পিউটার বা যে কোন বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা দেখাতে পারে।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে অটিজম বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে আশংকাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। ১৯৬৬ সালে প্রতি ২০০০ জনে ১ জন , ১৯৯৬ প্রতি ৫০০-১০০০ জনে ১ জন এবং ১৯৯৯ সালে প্রতি ৩৩৩ জনে ১ জন অটিজমে ‌আক্রাান্ত বলে গবেষণার মাধ্যমে জানান । বর্তমানে আমেরিকায় প্রতি ৩৬ জনে ১ জন এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি ৬৮ জনে ১ জন অটিজমে আক্রান্ত (উৎস- ইন্ডিয়া অটিজম সেন্টার)। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার (মার্চ ২০২২)হিসেবে প্রতি ১০০ জন ১ জন অটিজমে আক্রান্ত। বাংলাদেশে কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই তবে এর সংখ্যা অনুরূপ বলে ধারনা করা হয়। অটিজমে আক্রান্ত ছেলে মেয়ের আনুপাতিক হার ৪ঃ.১ । অর্থাৎ প্রতি ৪ টি ছেলের মধে ১ টি মেয়ে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয়ে জন্মায়।

অটিজম রোগটির কারণ এখনও জানা যায়নি। উন্নত দেশগুলোতে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন,বৃদ্ধি বা ফাংশনের অস্বাভাবিকতার কারনে অটিজম হয়ে থাকে। জন্মের সময়, পূবে, বা পরে মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক রাসায়নিক প্রতিক্রয়িার ফলে অটিজম
হতে পারে। জেনিটিক ফ্যাক্টরও খুব গুরুত্বপূর্ণ। লালন পালনে অভিভাবকের অবহেলা, অভিভাবকের মানসিক অবস্থা, আদর স্নেহের অভাব থেকে অটিজম হতে পারেনা । আবার পরিবারের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা জীবন যাপনের ধারার উপর নির্ভর করে অটিজম হয় না।

পরিবেশ জনিত কারনে যেমন এম এম আর ভ্যাকসিন, খাবারের গøুটেন, ক্যাসিন, ক্যান্ডিডা এলবিকানস নামক ছত্রাক,বিষাক্ত কেমিক্যাল,যেমন মার্কারী, কীটনাশক, শিল্পকারখানার বর্জ্য ইত্যাদিকে দায়ী করা হলেও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় প্রমান করা যায়নি। তাই যথাযথ পর্যবেক্ষণ ছাড়াই দুধ বা এ জাতীয় খাবার না খাওয়ানো অযৌক্তিক যা শিশুকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলে।

অটিজমের কোন যাদুকরী চিকিৎসা নেই। অটিজম ডায়াগনসিসের কোন বায়োলজিক্যাল মার্কার বা মেডিকেল ডিটেকশন নেই। বিভিন্ন বৈশিষ্ট ও লক্ষণ দেখে অটিজম সনাক্ত করা সম্ভব। আমেরিকান সাইকিয়্যাট্রিক এসোসিয়েশন এর ডিএসএম-৫ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে অটিজম ডায়াগনসিস করা সম্ভব। অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুর ডায়াগনসিস ও ইন্টারভেনশন যত ছোট বয়সে শুরু করা যায় তত বেশি উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইন্টারভেনশন বলতে শিশুর সাথে ইন্টারএ্যাকশান, তার উপযোগী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বোঝায়। খুব কম বয়সে অটিজম ডায়াগনসিস হওয়া অত্যন্ত জরুরী। দ্রুত রোগ নির্ণয় ও ইনটেনসিভ ইন্টাভেনশন অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুর সামগ্রিক উন্নতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, স্থায়ী এবং ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিটি অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুর প্রতিভা ও সীমাবদ্ধতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে একটি যথোপযোগী শিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে পারলে এরা বিশেষভাবে উপকৃত হতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের বাবা-মা থেকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর সাথে কাজ করার উপযোগী হতে হবে।

১৯৪৩ সাল থেকে অদ্যাবধি অটিজমের কারন অজানা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজন হলেও সত্য আমাদের দেশে অটিজম ভালো করার নানা রকম বিজ্ঞাপন স্যোশাল মিডিয়ায় বা বিভিন্নভাবে প্রচার করা হয় যা অভিভাবকদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ স্বার্থ হাসিল ছাড়া আর কিছুই নয়। অটিজমের কারণ বা তার বর্তমান অবস্থা জানার জন্য দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায়/কেন্দ্রে ঘুরে সময় বা অর্থ নষ্ট করার চেয়ে অপরিহার্য পরিণত বয়সে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তি যাতে আত্বনির্ভরশীল জীবন যাপন করতে পারে সেজন্য চেষ্টা করা জরুরী। বিশেষ করে লাইফ
ম্যানেজমেন্ট স্কিল বৃদ্ধি করা জরুরী নিজে নিজে টয়লেট ব্যবহার করা, দাঁত ব্রাশ করা, পোশাক পরা, নিজের প্রয়োজনে অন্যের সাথে যোগাযোগ করা, টাকা বিনিময় করা, রাস্তা পার হওয়া, কোন বিপদ বা শারীরিক নির্যাতন থেকে নিজেকে রক্ষা করা ইত্যাদি শেখানো জরুরী।
সবচেয়ে প্রয়োজন অভিভাবকের নিজস্ব চিন্তা, বুদ্ধি বিবেচনাকে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সন্তানে কাজে লাগানো জরুরী। প্রয়োজনে বিশেষ স্কুল বা অন্য অভিভাবকদের পরামর্শকে কাজে লাগাতে পারে। মানসম্মত বিশেষ স্কুলগুলো সামগ্রিকভাবে টয়লেট ট্রেনিং, যোগাযোগ দক্ষতা,
আচরণগত দক্ষতা, সঙ্গীত, একাডেমিক, শরীর চর্চা, ছবি আকাঁ, ফাইন মটর (বোতাম লাগানো, বোতলের মুখ খোলা/লাগানো, কলম /পেন্সিল ধরা, ছিদ্র কাগজে সুতা পরা) গ্রোস মোটর কার্যক্রম (সিড়িতে উঠা/নামা, সাইকেল চালানো, দৌঁড়ানো, লাফানো)আউটিং খেলাধুলা, প্রিভোকেশনাল/ ভোকেশনাল এ্যাকটিভিটি ইত্যাদি কার্য।

অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর কথা বলার চেয়ে জরুরী যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করা যা শিশুর সামগ্রিক জীবনযাপনে ভ‚মিকা রাখে । আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত বিশেষ স্কুলই সর্বোত্তম। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু বা ব্যক্তির পরিবর্তনের চেয়ে প্রয়োজন শিশুর সাথে সম্পৃক্ত
ব্যক্তিদের নিজেকে, নিজের পরিবেশকে অটিজম বৈশিষ্টসম্পন্ন শিশুদের উপযোগী করে সাজানো, ধৈর্য্য ধরে প্রতিদিন শিশুর সাথে খেলার ছলে কিছু শেখানো আর অন্য কোন শিশুর সাথে তুলনা না করা। বন্ধূসুলভ অনুকূল পরিবেশ পেলে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুরা সমাজের বোঝা না হয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে সর্ম্পক্ত হয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। আর এটাই একটি পরিবার বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রত্যাশা। ভালো থাকুক আদরের বিশেষ শিশু ও ব্যক্তিরা।
 

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, মুনফ্লাওয়ার অটিজম ফাউন্ডেশন

মন্তব্য করুন: