• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬

আলগা হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন

কী কারণে সন্তানের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন মা-বাবা?

মো. অসীম চৌধুরী 

প্রকাশিত: ১৪:৩০, ৯ মার্চ ২০২৩

আপডেট: ১৮:৪৪, ৯ মার্চ ২০২৩

ফন্ট সাইজ
কী কারণে সন্তানের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন মা-বাবা?

প্রতীকী ছবি

সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। বড় নরম এ দেশের মাটি। নরম মানুষের মন। গভীর মমতায় সন্তান মানুষ করে বাংলার মা-বাবা। সন্তান ও বাবা-মায়ের সম্পর্ক এখানে অনেক নিবিড়।

সন্তানের বিরহে যেমন মাতৃহৃদয় কেঁদে ব্যাকুল হয় তেমনি সন্তানও অকুল হয় মাতৃস্নেহের পিপাসায়। এ দেশের কবি মাতৃভক্তি প্রকাশ করে কবিতা লেখেন, ‘‘মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই, তাহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।’’ অথবা ‘‘মাগো, তোর কান্না আমি সইতে পারি না। দোহাই মা আমার লাগি আর কাঁদিস না।’’ ... এসব শুনে আবেগে জড়াতো মা অথবা সন্তানের হৃদয়। মা-বাবা সন্তানের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল আর সন্তান মা-বাবার সবচেয়ে বড় আকাঙ্খার স্থান।

কিন্তু বর্তমান আধুনিক পরিবারগুলো এখন পরিণত হয়েছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। মা-বাবার কাছ থেকে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছেন সন্তানেরা। এক পরিবারে থেকেও মা-বাবা ও সন্তানেরা দিন কাটাচ্ছেন যে যাঁর মতো করে। পারিবারিক বন্ধন আর আগের মতো দৃঢ় নয়, হয়ে পড়েছে বড়ই ঠুনকো।

সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুর, মৌলভীবাজার ও সিরাজগঞ্জ জেলায় সন্তানের হাতে প্রাণ গেছে তিনজন মায়ের। লাঠির আঘাত ও প্রহার করায় এবং বঁটি দিয়ে গলা কেটে ফেলায় প্রাণ হারান এই মায়েরা। তিন স্থানেই পুলিশ ঘাতক সন্তানদের গ্রেপ্তার করেছে। 

গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী থানার দেওলিয়াবাড়ী এলাকায় ছেলে তার বৃদ্ধা মা জোসনা বেগমকে (৭০) বঁটি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে। পুলিশ ঘাতক ছেলে শাখাওয়াত হোসেন মাসুমকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে। জোসনা বেগম কাপাসিয়া উপজেলার টোক এলাকার খলিলুর রহমানের স্ত্রী।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনাবাড়ী থানার এসআই ফোরকান মোল্লা স্বজনদের বরাত দিয়ে জানান, শাখাওয়াত হোসেন মাসুম মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। জোসনা বেগম কয়েক দিন আগে মাসুমকে নিয়ে দেওলিয়াবাড়ীতে মেয়ে খাদিজার বাসায় আসেন। বুধবার (৮ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে খাদিজা তার কাজে বাসা থেকে বের হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর মাসুম পাশের ঘরে জোসনা বেগমকে ডেকে এনে বঁটি দিয়ে গলা কেটে ফেলে। এতে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলেই জোসনা বেগমের মৃত্যু হয়। আশপাশের লোকজন টের পেয়ে থানায় খবর দেয়।

পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

এদিকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে আলীনগর চা বাগানে ছেলের লাঠির আঘাতে মায়ের মৃত্যু হয়েছে। মৃত দেয়ন্তী নুনিয়া (৫১) আলিনগর চা বাগান এলাকার বাসিন্দা। ছেলে সাধন নুনিয়ার (২৩) লাঠির আঘাতে তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। দেয়ন্তী নুনিয়া আলীনগর চা-বাগানের বড় লাইনের মৃত জাইয়া নুনিয়ার স্ত্রী। পুলিশ ঘাতক ছেলে সাধনকে আলীনগর চা বাগান থেকে গ্রেপ্তার করে। এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে।

পরের ঘটনাটি সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায়, মাদকাসক্ত ছেলের প্রহারে বিধবা মা চায়না খাতুন (৬০) নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় ছেলে শরিফুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৭ মার্চ) রাতে সলঙ্গা থানার নাইমুড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

সলঙ্গা থানার উপপরিদর্শক মশিউর রহমান জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মহাসড়কে গাড়িচাপায় শরিফুল ইসলামের একটি ছাগলের বাচ্চা মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে মা চায়না খাতুনের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে চায়না খাতুনকে প্রহার করে শরিফুল। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাড়িতেই তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু রাত ১০টার দিকে তিনি মারা যান। পুলিশ রাতেই শরিফুলকে গ্রেপ্তার করে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। চায়না খাতুনের মেয়ে হাসি খাতুন বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন।

পরিবারের আপন মানুষটির কাছেই আরেকজন সদস্য ক্রমশ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। প্রাণ হারাচ্ছে। সামাজিক অপরাধের লাগামহীন বৃদ্ধিতে মানুষ উদ্বিগ্ন। দেশে এমন নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটছে যা আদিম বর্বরতাকেও হার মানায়। এ নিষ্ঠুরতার ব্যারোমিটার কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? আমরা দেখছি সময়ের সাথে বেড়ছে পারিবারিক অস্থিরতা। বেড়েছে নৃশংসতা - বলে জানান বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ শাহেদা বিনতে নূর। 

তিনি আরও বলেন, সন্তানের হাতে বাবা-মা নিহত হওয়ার ঘটনা কি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে না যে, আমরা কোন নষ্ট সমাজ, পঙ্কিল ‘সভ্যতা’র মধ্যে বসবাস করছি আমাদের কি চিন্তা করা উচিত নয় যে, এর থেকে উত্তরণের পথ কী? কোনো শিশু পৃথিবীতে পাপী হয়ে জন্ম নেয় না। জন্ম নেয় ফুলের মতো পবিত্র হয়ে, চাঁদের মতো হাসি আর নির্ঝরের মতো কান্না নিয়ে। তাকে পাপিষ্ঠ করে তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র।

সমাজবিজ্ঞানী ড. গাজী সালাহ উদ্দিন বলেন,‘অতিমাত্রায় আধুনিকতার প্রতি আগ্রহী হওয়ায় মানুষের মধ্যে সামাজিক এবং পারিবারিক আদর্শ লোপ পাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। ফলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা কমছে। আদর্শহীন ও রংচঙে আবহের কারণে ঘটছে নৈতিক অবক্ষয়। এতে করে পিতা-মাতাকে খুন করতে দ্বিধা করছে না সন্তানরা। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে মেনে চলতে হবে সামাজিক অনুশাসন এবং সুদৃঢ় করতে হবে পারিবারিক বন্ধন।’

অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক এবং বিকৃত মানসিকতার জন্য সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুনের মতো ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘নৈতিকতার চরম বিপর্যয়ের ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব। এতে করে তুচ্ছ ঘটনার কারণে প্রিয়জনকে খুন করতে দ্বিধা করছে না সন্তান।’

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: