• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

কবি রফিক আজাদ: জীবন ও কর্ম

দিলারা হাফিজ

প্রকাশিত: ২০:৩৬, ১০ এপ্রিল ২০২৬

আপডেট: ২১:৩৬, ১০ এপ্রিল ২০২৬

ফন্ট সাইজ
কবি রফিক আজাদ: জীবন ও কর্ম

মুক্তিযোদ্ধা ও কবি রফিক আজাদের জন্ম পহেলা ফাল্গুন, ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে। খ্রিষ্ট্রীয় ১৯৪৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। পিতা- সলিম উদ্দিন খান, মাতা- রাবেয়া খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে বি. এ. অনার্স ও এমএ করেছেন যথাক্রমে ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে।

বছর খানেক অধ্যাপনা করেছেন ভাসানী প্রতিষ্ঠিত মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ, কাগমারীতে। মুক্তিযুদ্ধে কাদের সিদ্দিকীর সহযোগী ছিলেন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের বিসিএস প্রথম ব্যাচ ৭২ ও ৭৩-এ নিয়োগ পেয়েও যোগদান না করে বাংলা একাডেমিতে চাকরি নেন। সেখানেই উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বারো বছর। 

ইত্তেফাক ভবন থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক রোববার’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত। নিজে ‘ঘরে বাইরে’ নামে একটি ক্ষণজীবী পাক্ষিক পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। সর্বস্বান্ত হয়ে অবশেষে পুনরায় চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন। এবার বাংলাদেশ জুটমিল কর্পোরেশনের উপমহাব্যবস্থাপক। ৯০ থেকে ৯৩ সাল পর্যন্ত। এরপর বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের কবিতা বিষয়ক প্রশিক্ষক। পরবর্তী সময়ে নেত্রকোনার বিরিশিরিতে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমির পরিচালক ছিলেন ৯৭ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত। সর্বশেষ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব শেষে অবসরে যান। নাট্যকার সেলিম আল দীনের আহ্বানে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ববিভাগে কিছুকাল খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও করেন।

সাহিত্যকৃতি

কবি রফিক আজাদের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৩৬টি। একটি মাত্র আত্মজীবনীমূলক গদ্যগ্রন্থ- ‘কোনো খেদ নেই’। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অসম্ভবের পায়ে’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৩ সালে। এরপর ‘সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে’ প্রকাশ পায় ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুখ্যাত পরিবেশবাদী কাব্যগ্রন্থ ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভূক্ত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে পাঠ্য হয়েছে কবির কবিতা ‘নগর ধ্বংসের আগে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের বাংলা বিভাগের সিলেবাসের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভূক্ত কবি রফিক আজাদের জীবন ও সাহিত্যকর্ম।

হাজার বছরের বাংলা কবিতায় অবদানের জন্য পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮১ সালে। এছাড়া হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, কবিতালাপ পুরস্কার, ব্যাংক পুরস্কার, সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার, কবি আহসান হাবীব পুরস্কার, হাসান হাফিজুর রহমান পুরস্কার, পদাবলি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৩ সালে পান দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা পুরস্কার একুশে পদক।

রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ 

রফিক আজাদের প্রয়াণের পর ২০১৭ সালে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ’। এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন (প্রয়াত)। সম্পাদক ছিলেন কবি ও গবেষক দিলারা হাফিজ। পরবর্তী সভাপতি ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী (প্রয়াত)। সে সময় সম্পাদক হন কবি খোরশেদ বাহার। বর্তমান এই পর্ষদের সভাপতি কবি ফারুক মাহমুদ। সম্পাদক হিসেবে আছেন কবি আবদুর রব। 

২০২১ সাল থেকে কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ প্রতি বছর কবির জন্মোৎসব উপলক্ষে একটি পুরস্কার প্রদান করে আসছে। এই পুরস্কারের মূল্যমান পঞ্চাশ হাজার টাকা, উত্তরীয় ও ক্রেস্ট। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১২তম সভায় পুরস্কার প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করেছিলেন পর্ষদের গবেষণা সম্পাদক, কবি আবুল হাসনাত। তিনি লেখেন, কবি রফিক আজাদ একজন প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য কবি ছিলেন। তাঁর সমাজ-অঙ্গীকার ও কবিতা সৃজন ভিন্ন মাত্রা সঞ্চার করেছিল। তাঁর নামে যে পুরস্কার প্রবর্তিত হতে যাচ্ছে তা শুধুমাত্র সম্ভাবনাময় এবং অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্য আছে এমন কবিকে দিতে হবে। তবে যেহেতু রফিক আজাদ রণাঙ্গণের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পেশাগতভাবে সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, সে জন্য মুক্তিযুদ্ধ ও সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও এই পুরস্কার দেয়া যেতে পারে। কিন্তু এই পুরস্কার মরণোত্তর কারো জন্য নয়।

এই নীতিমালা অনুসরণ করেই ২০২১ সাল থেকে কবিতা, মুক্তিযুদ্ধ বা সাহিত্য সাংবাদিকতার যে কোনো একটি শাখায় প্রতি বছর ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করে যাচ্ছে এই পর্ষদ।

‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার’ শিরোনামে প্রবর্তিত এই পুরস্কারে ইতোমধ্যে ভূষিত হয়েছেন দেশের ৪ জন বিশিষ্ট কবি, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন সাহিত্য সাংবাদিক। তারা হলেন যথাক্রমে-২০২১–কবি ফারুক মাহমুদ, ২০২২—কবি ফেরদৌস নাহার, ২০২৩—মুক্তিযোদ্ধা ও কবি বুলবুল খান মাহবুব (মুক্তিযুদ্ধ), ২০২৪–কবি বায়তুল্লাহ কাদরী, ২০২৫—কবি ময়ুখ চৌধুরী, ২০২৬—কবি ওবায়েদ আকাশ (সাহিত্য সম্পাদনা)। 

এছাড়াও এই পর্ষদ ২০১৭ সালে প্রথম কবির অবর্তমানে তাঁর পঁচাত্তরতম জন্মোৎসবের আয়োজনকে সামনে রেখে কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইনের সম্পাদনায় রফিক আজাদের ৭৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশ করে ‘কবিতা—৭৫’ নামের একটি গ্রন্থ। 

অন্যান্য

২০১৮ সালে কবির সাক্ষাৎকার নিয়ে চিত্রা প্রকাশনী প্রকাশ করে ‘মুখোমুখি রফিক আজাদ’ নামের আরেকটি গ্রন্থ। পরের বছর ‘আনন্দ বেদনা যজ্ঞে রফিক আজাদ’ শিরোনামে আমার একটি স্মৃতিগদ্য প্রকাশ করে চিত্রা প্রকাশনী। এর পরের বছর কবিকে নিয়ে আমার স্মৃতি উপন্যাস ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ প্রকাশ করে ঐতিহ্য প্রকাশনী।

২০২৬ সালে কবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে স্টুডেন্ট ওয়েজ প্রকাশ করেছে কবির গদ্য, চিঠিপত্র ও সাক্ষাৎকার নিয়ে ‘কবিতা ভাবনা ও অন্যান্য’ শিরোনামে একটি স্বাদু গদ্যের বই।

ইতোমধ্যে আমাদের কানাডা প্রবাসী দুই পুত্র অভিন্ন আজাদ ও অব্যয় আজাদ তাদের বাবার নামে খুলেছে rafiqazad.com শিরোনামে একটি ওয়েবসাইট। এখানে কবি রফিক আজাদের কবিতা বাংলায় এবং ইংরেজি ভাষায় পাঠ এবং কিছু কবিতার আবৃত্তি শোনা যাবে। ধীরে ধীরে আরো বেশি তথ্যভিত্তিক হবে এটি।

আমরা বিশ্বাস করি একজন কবি বেঁচে থাকেন তাঁর কালজয়ী পংক্তিমালায়— অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পাঠকের হৃদয়ে। কবি রফিক আজাদও এভাবেই প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। 

লেখক
কবি ও গবেষক 
দিলারা হাফিজ
সাবেক চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা
প্রধান উপদেষ্টা, কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ 

বিভি/এসজি

মন্তব্য করুন: