• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শতবর্ষী যে মসজিদে মিশে আছে মুসলিমদের আত্মত্যাগ ও ফ্রান্সের ইতিহাস

প্রকাশিত: ১৮:৫৩, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৮:৫৭, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
শতবর্ষী যে মসজিদে মিশে আছে মুসলিমদের আত্মত্যাগ ও ফ্রান্সের ইতিহাস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে লড়াই করা মুসলিম সেনাদের সম্মানে ১০০ বছর আগে প্যারিসে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি বিশাল মসজিদ। সময়ের পরিক্রমায় সেটিই এখন ফরাসি রাজধানীর ব্যস্ত লাতিন কোয়ার্টারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শতবর্ষ পূর্তিতে মসজিদটিতে জড়ো হওয়া মুসল্লিরা আজকের ফ্রান্সে মুসলিম হিসেবে তাদের অবস্থান নিয়েও ভাবছেন।

প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের রেক্টর শেমস-এদ্দিন হাফিজ এটিকে আন্তধর্মীয় সংলাপ ও ফ্রান্সের বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে বিভাজনমূলক রাজনৈতিক প্রচারণার প্রভাবে দেশে ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়তে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) হাফিজ বলেন, ‘মুসলিমদের জাতীয় সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে দেখাটা সবার দায়িত্ব।’

শুক্রবার শতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ নামাজে অংশ নিতে প্যারিস ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মসজিদটিতে আসেন। তাদের কেউ ফ্রান্সে জন্মেছেন, আবার কেউ কয়েক দশক আগে আলজেরিয়া, সেনেগালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফ্রান্সে এসেছেন। তাদের অনেকের শিকড় ফ্রান্সের সাবেক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত।

প্যারিসের পর্যটন দপ্তরের ওয়েবসাইটে শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে গ্র্যান্ড মসজিদের নাম রয়েছে। কারুকার্যখচিত ও কার্পেট বিছানো নামাজের কক্ষকে সেখানে ‘অবশ্যই দেখার মতো’ স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্পেনের গ্রানাদার আলহামব্রা প্রাসাদ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নির্মিত এই মসজিদের মিনারের উচ্চতা ৩৩ মিটার বা ১০৮ ফুট। সেখান থেকে সিন নদীর দৃশ্য দেখা যায়। কাছেই থাকা নোত্র দাম ক্যাথেড্রালের জোড়া টাওয়ারের পাশে মসজিদের মিনারটি স্থাপত্যের সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। মসজিদ প্রাঙ্গণে রয়েছে জনপ্রিয় চা-কক্ষ ও হাম্মাম বা বাষ্পস্নানের ব্যবস্থাও।

তবে পর্যটন আকর্ষণের পাশাপাশি এটি মূলত মুসলিমদের উপাসনালয় এবং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক স্মারক।

হাফিজ জানান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সকে রক্ষা করতে ভার্দ্যাঁসহ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেওয়া মুসলিম সেনাদের ‘রক্তের ঋণ’ স্মরণ করতেই মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নিহত এসব সেনার বেশিরভাগই আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশগুলো থেকে এসেছিলেন।

নাৎসি দখলদারত্বের সময় প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের ইমাম ছিলেন আবদেলকাদের মেসলি। হাফিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ইহুদিদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদে রাখার জন্য ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহে সহায়তা করেছিলেন। পরে তাকেও আটক করে মৃত্যু শিবিরে পাঠানো হয়। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে ফিরলেও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং কয়েক বছর পর মারা যান।

২০১৫ সালে মেসলির পরিবারের সদস্যরা সেই সময়কার নথিপত্রসহ কিছু নোটবুক খুঁজে পাওয়ার পর যুদ্ধকালীন সময়ে তার এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

হাফিজ বলেন, ‘মসজিদটি নির্মাণের সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট গ্যাস্তোঁ দোমের্গ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ফ্রান্সের বৈচিত্র্যই দেশটির জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।’

তার মতে, ১৯২৬ সালের সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বার্তা এখনো বদলায়নি। তবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে।

হাফিজ বলেন, ‘আজও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে। ইসলামকে প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়। মুসলিম বা ইসলাম নিয়ে কথা বললেই অনেক সময় বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।’

ফ্রান্সে ইসলাম এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সেই মুসলিম জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে দেশটির মুসলিমরা এখনো সমাজে পূর্ণাঙ্গ গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন এবং বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত এক দশকে ফ্রান্সে কয়েকটি প্রাণঘাতী ইসলামপন্থি উগ্রবাদী হামলার পর মুসলিমদের ঘিরে নেতিবাচক ধারণা আরও তীব্র হয়েছে।

এদিকে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্রান্সে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। নির্বাচনী আলোচনায় ডানপন্থি ন্যাশনাল র‍্যালি ও দলটির নেত্রী মেরিন লে পেনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলটি ইসলাম ও অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।

গ্র্যান্ড মসজিদের স্বেচ্ছাসেবী ফাতমা চুচানে ফরাসি স্কুল ও কিছু কর্মক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের হিজাব পরার ওপর থাকা বিধিনিষেধের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি ফ্রান্সের কাছে অনুরোধ করব, এসব মানুষকে তাদের মতো থাকতে দেওয়া হোক এবং তাদের ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে দেওয়া হোক।’

তবে শতবর্ষের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অন্য মুসল্লিদের মতো তিনিও মূলত সহনশীলতা ও সম্প্রীতির বার্তার ওপর গুরুত্ব দেন।

ফাতমা বলেন, ‘এটি একটি প্রতীক। মুসলিমদের জন্য এটি প্যারিসের একটি জাদুঘরের মতো। আমাদের সবাইকে একে অপরের পাশে থাকতে হবে।’

সেনেগাল থেকে ফ্রান্সে আসার পর গ্র্যান্ড মসজিদই ছিল ইব্রাহিমা সেয়ের পরিদর্শন করা প্রথম স্থানগুলোর একটি।

তিনি বলেন, ‘এটি সবসময় খোলা থাকে। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এটি ভালো একটি জায়গা। একই সঙ্গে আমি দেখি, অনেক পর্যটকও এই মসজিদকে পছন্দ করেন।’ -সূত্র: ডেইলি সাবাহ

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: