কবিরা গুনাহ কী? যেসব পাপ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি
ছবি: সংগৃহীত
ইসলামে কিছু পাপকে কবিরা গুনাহ বা বড় পাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পাপ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিরক, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মতো অপরাধকে হাদিসে গুরুতর পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কবিরা গুনাহ কী এবং কোন পাপগুলো থেকে একজন মুসলমানের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি?
কবিরা গুনাহ কী?
কবিরা গুনাহ বলতে এমন গুরুতর পাপকে বোঝায়, যেসব কাজের ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো পাপের ক্ষেত্রে অভিশাপ, আল্লাহর ক্রোধ কিংবা জাহান্নামের শাস্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। আলেমরা এসব দলিলের ভিত্তিতে কবিরা গুনাহের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
কবিরা গুনাহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, তিনি তার সঙ্গে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না, যদি কেউ তাওবা না করে সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তবে যেকোনো পাপ থেকে জীবিত অবস্থায় আন্তরিকভাবে তাওবা করলে আল্লাহর ক্ষমার আশা করা যায়। সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪৮-এ এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
যেসব কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি
১. শিরক করা
আল্লাহর ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করা ইসলামে সবচেয়ে গুরুতর পাপ। ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর বিশেষ অধিকার অন্যের জন্য নির্ধারণ করার বিষয়ে প্রত্যেক মুসলমানকে সতর্ক থাকতে হবে।
২. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা
নিরপরাধ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা গুরুতর কবিরা গুনাহ। পবিত্র কোরআনে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে।(সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩২)।
৩. জাদু করা
জাদু ও এমন কর্মকাণ্ড, যা শিরক বা হারাম উপায়ে মানুষের ক্ষতি করার সঙ্গে যুক্ত, ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিতে গিয়ে জাদুর কথা উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৯)।
৪. সুদ খাওয়া
সুদভিত্তিক লেনদেন ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোরআনে সুদ পরিত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৮–২৭৯)।
৫. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা
এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা গুরুতর পাপ। যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তাদের ব্যাপারে কোরআনে জাহান্নামের আগুনের কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।(সূরা আন-নিসা, আয়াত ১০)।
৬. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া
মিথ্যা সাক্ষ্য মানুষের অধিকার নষ্ট করে, নিরপরাধ ব্যক্তিকে বিপদে ফেলে এবং সমাজে অন্যায় ছড়িয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াকে বড় পাপগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেছেন।(সহিহ বুখারি, হাদিস ২৬৫৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৭)।
৭. পিতা-মাতার অবাধ্যতা ও তাঁদের কষ্ট দেওয়া
পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া, অবহেলা করা এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে পাপের কাজে তাদের আনুগত্য করা যাবে না; সে ক্ষেত্রেও তাদের সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখতে হবে। (সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৩–২৪; সহিহ বুখারি, হাদিস ২৬৫৪)।
৮. ব্যভিচার ও অবৈধ যৌন সম্পর্ক
ইসলামে ব্যভিচার নিষিদ্ধ। শুধু এ কাজে লিপ্ত হওয়া নয়, বরং এর দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন পথ থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।’ (সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩২)।
৯. চুরি ও অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা
অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা, চুরি করা কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের অধিকার নষ্ট করা গুরুতর অপরাধ। সম্পদের মালিকের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং অন্যায় থেকে তাওবা করা জরুরি।(সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯)।
১০. গিবত ও অপবাদ দেওয়া
কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে, তা গিবত। আর কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ করা অপবাদ। উভয় কাজই ইসলামে নিষিদ্ধ। অপবাদ ও মিথ্যা অভিযোগ মানুষের সম্মান এবং সামাজিক সম্পর্ক ধ্বংস করতে পারে। (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২; সূরা আন-নূর, আয়াত ৪)।
১১. মিথ্যা বলা ও প্রতারণা করা
মিথ্যা, জালিয়াতি, ব্যবসায় প্রতারণা এবং আমানতের খেয়ানত মানুষের অধিকার নষ্ট করে। এসব কাজ থেকে বেঁচে থাকা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।(সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত ১–৩; সূরা আল-আনফাল, আয়াত ২৭)।
১২. অহংকার করা
অহংকার মানুষকে সত্য প্রত্যাখ্যান করতে এবং অন্যকে তুচ্ছ ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অহংকারের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১)।
কবিরা গুনাহ হয়ে গেলে কী করবেন?
কোনো ব্যক্তি কবিরা গুনাহে জড়িয়ে পড়লে তার উচিত হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করা। তাওবার জন্য পাপ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা জরুরি। কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা যথাযথভাবে তার প্রতিকার করতে হবে।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তারা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।(সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)।
কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের অধিকার, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়িত্বও জড়িত। তাই একজন মুসলমানের উচিত কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, পাপ থেকে দূরে থাকা এবং ভুল হয়ে গেলে দ্রুত তাওবা করা।
কবিরা গুনাহের তালিকা শুধু এই কয়েকটি পাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আলেমদের আলোচনায় আরও বিভিন্ন পাপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট কাজ কবিরা গুনাহ কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কোরআন-হাদিসের দলিল ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিভি/এনএইচ













মন্তব্য করুন: