• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কি ইসলামে হারাম? আফগানিস্তানের নিষেধাজ্ঞা ঘিরে বিতর্ক!

প্রকাশিত: ১৪:৩৭, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৪:৩৯, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কি ইসলামে হারাম? আফগানিস্তানের নিষেধাজ্ঞা ঘিরে বিতর্ক!

ছবি: সংগৃহীত

চোখের আলো হারিয়ে অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন কেউ। আবার কারও চোখে কর্নিয়ার জটিলতায় কমে গেছে দৃষ্টিশক্তি। এমন রোগীদের জন্য আশার আলো হতে পারে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন। কিন্তু এই চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়েই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিষয়টি। তালেবান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ইসলামি শরিয়তের দোহাই দিয়ে এই চিকিৎসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রশ্ন হলো, মানুষের চোখের কর্নিয়া অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপন করা কি সত্যিই ইসলামে নিষিদ্ধ? এ বিষয়ে ইসলামি ফিকহ কী বলে?

কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কী?
কর্নিয়া হলো চোখের সামনের স্বচ্ছ পর্দা, যার মধ্য দিয়ে আলো চোখের ভেতরে প্রবেশ করে। কোনো কারণে কর্নিয়া ঘোলা, ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর হয়ে গেলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়ার পরিবর্তে সুস্থ কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চিকিৎসাকে বলা হয় কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্ট বা কর্নিয়া প্রতিস্থাপন।

সাধারণত মৃত ব্যক্তির দান করা কর্নিয়া সংগ্রহ করে এ চিকিৎসা করা হয়। এর মাধ্যমে কর্নিয়াজনিত সমস্যায় দৃষ্টিশক্তি হারানো অনেক রোগীর আবার দেখার সুযোগ তৈরি হয়।

আফগানিস্তানে কেন বন্ধ হলো কর্নিয়া প্রতিস্থাপন?
২৮ অক্টোবর গণমাধ্যমে এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ কর্নিয়া প্রতিস্থাপনকে ইসলামপরিপন্থি বিবেচনা করে চিকিৎসকদের এই অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। দেশটির চিকিৎসকদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, মৌখিক নির্দেশের পর হাসপাতালগুলোতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধ হয়ে যায়।

কাবুলের নূর আই হাসপাতালের চিকিৎসক ড. নূর জামান হাশিম জানান, নির্দেশ আসার আগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের হাসপাতালে ৯০টি সফল কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের কারণে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বহু রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে স্পেনের সংবাদ সংস্থা ইএফইর ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আফগানিস্তানের পুণ্য প্রচার ও পাপ প্রতিরোধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাইফুর রহমান খাইবারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, তাদের মন্ত্রণালয় কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধের বিষয়ে সাম্প্রতিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে মানবদেহের অঙ্গ কেনাবেচা নিষিদ্ধ বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

অর্থাৎ, চিকিৎসকদের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার তথ্য এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে কিছু তারতম্য রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানা জরুরি।

ইসলামি শরিয়তে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের বিধান কী?
এ বিষয়ে ইসলামি আলেম ও ফিকহবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি নির্দিষ্ট শর্তে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অনুমতি দিয়েছে।

১৯৮৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির চতুর্থ অধিবেশনে অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিষয়ে এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

সিদ্ধান্তে বলা হয়, মৃত ব্যক্তির অঙ্গ অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপন করা বৈধ হতে পারে, যদি এর মাধ্যমে জীবন রক্ষা করা অথবা শরীরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুর আগে দাতার অনুমতি অথবা মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের সম্মতি থাকতে হবে। তবে অঙ্গ কেনাবেচার মাধ্যমে সংগ্রহ করা যাবে না।

একই সিদ্ধান্তে জীবিত ব্যক্তির দুই চোখের কর্নিয়া অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। কারণ এতে দাতা তার দৃষ্টিশক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্ষমতা হারাবেন।

জর্ডানের সরকারি ইফতা বিভাগ কী বলেছে?
মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া দানের বিষয়ে জর্ডানের সরকারি ইফতা বিভাগও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ১৯৮৪ সালের ১১ এপ্রিল জর্ডানের ইফতা বোর্ডের দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে বলা হয়, মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া অন্ধ ব্যক্তি অথবা দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির চোখে প্রতিস্থাপন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ।

তবে এ ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত উল্লেখ করা হয়:
১. কর্নিয়া দাতার মৃত্যু নিশ্চিত হতে হবে।
২. চিকিৎসকদের ধারণা থাকতে হবে যে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সফলতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. মৃত্যুর আগে দাতা অনুমতি দিয়ে যাবেন অথবা তার উত্তরাধিকারীরা অনুমতি দেবেন।

জর্ডানের ইফতা বিভাগ তাদের সিদ্ধান্তে আরও উল্লেখ করে, এ ধরনের প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একজন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া শরিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ ও ক্ষতি প্রতিরোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তাহলে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কি হারাম?
সব অবস্থায় কর্নিয়া প্রতিস্থাপনকে হারাম বলার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি এবং জর্ডানের সরকারি ইফতা বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ হতে পারে।

অন্যদিকে, কিছু আলেম মৃত ব্যক্তির দেহের অখণ্ডতা ও মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনা করে অঙ্গ সংগ্রহের বিরোধিতা করেন। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে ফিকহি মতপার্থক্য রয়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, অঙ্গ কেনাবেচা এবং বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় অঙ্গ দান এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্তেও অঙ্গ বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বিভি/এনএইচ

মন্তব্য করুন: