স্যরি বললেই কি ক্ষমা করা উচিত? ইসলাম কী বলে?
মানুষ মাত্রই ভুল করে। কখনো কথায়, কখনো আচরণে আবার কখনো অসতর্কতায় অন্যের মনে কষ্ট দিয়ে ফেলে। তবে ভুল বুঝতে পেরে কেউ যখন ‘স্যরি’ বলে ক্ষমা চায়, তখন তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে?
ইসলামে ক্ষমা ও উদারতাকে অত্যন্ত মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারও অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকলেও ক্ষমা করে দেওয়াকে উৎসাহিত করেছে ইসলাম। বিশেষ করে কেউ নিজের ভুল বুঝতে পেরে আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উত্তম চরিত্রের পরিচয়।
মানুষকে ক্ষমা করার নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম
পবিত্র কোরআনে মুমিনদের অন্যতম গুণ হিসেবে রাগ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, অন্যের ভুলের কারণে রাগ হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্ষমার মানসিকতা রাখা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ক্ষমা করলে মর্যাদা বাড়িয়ে দেন আল্লাহ
কাউকে ক্ষমা করলে নিজের সম্মান কমে যায়, এমন ধারণা ইসলামে সমর্থিত নয়। বরং ক্ষমা করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে মর্যাদা বাড়ে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কমে না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮) অর্থাৎ কাউকে ক্ষমা করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি উদারতা ও উত্তম চরিত্রের পরিচয়।
কেউ স্যরি বললেই কি ক্ষমা করে দিতে হবে?
কেউ ক্ষমা চাইলেই তার সব আচরণ মেনে নিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। ক্ষমা করা এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া এক বিষয় নয়। কেউ আন্তরিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হলে তাকে ক্ষমা করা উত্তম। তবে একই ব্যক্তি বারবার কষ্ট দিলে নিজের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে দেয় এবং সংশোধন করে নেয়, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে।’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ৪০) এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ক্ষমা তখনই বিশেষ মর্যাদার বিষয় হয়ে ওঠে, যখন তা সংশোধন ও কল্যাণের পথ তৈরি করে।
অন্যের অধিকার নষ্ট করলে শুধু সরি বলাই যথেষ্ট নয়
কারও সম্পদ নষ্ট করা, আর্থিক ক্ষতি করা কিংবা অন্য কোনো অধিকার নষ্ট করার মতো ঘটনা ঘটলে শুধু মুখে ‘সরি’ বলাই যথেষ্ট নয়। যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি যথাসম্ভব সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কারণ ইসলামে মানুষের হক বা অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই আন্তরিক অনুতাপের পাশাপাশি অন্যায়ের প্রতিকার করাও জরুরি।
তাহলে কেউ স্যরি বললে কী করবেন?
ইসলামের শিক্ষা হলো, অন্যের ভুলের প্রতি উদার হওয়া, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সম্ভব হলে ক্ষমা করে দেওয়া। কেউ আন্তরিকভাবে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে অহংকার বা প্রতিশোধের মনোভাব না রেখে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
তবে ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে, একই অন্যায় বারবার সহ্য করতে হবে। বরং ক্ষমার পাশাপাশি ভুলকারী ব্যক্তির সংশোধন হওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ভুল না করার চেষ্টা করাও জরুরি।
মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যের ভুল ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা, দুটিই সুন্দর চরিত্রের পরিচয়। তাই কেউ আন্তরিকভাবে ‘স্যরি’ বললে তাকে ক্ষমা করে দেওয়াই উত্তম। এতে শুধু সম্পর্কই সুন্দর হয় না, আল্লাহর কাছেও রয়েছে বিশেষ প্রতিদানের আশা।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: