• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ, তদন্তের দাবি জামায়াতের ৫ এমপির

রাজেক জাহাঙ্গীর, যশোর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬:০১, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ, তদন্তের দাবি জামায়াতের ৫ এমপির

যশোরের ৯৩টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। 

তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবসায়ী ও কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিক পরিচয় এবং অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অনেককে সার ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে। এমনকি একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি, মাদক কারবারে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীও ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা। এই পরিস্থিতিতে বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে সৎ ও যোগ্য ব্যবসায়ীদের ডিলার নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন পাঁচ সংসদ সদস্য।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর)  প্রেসক্লাব যশোরে এক সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ সংসদ সদস্যের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন যশোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের পরামর্শ ও সুপারিশ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক সরকার দলীয় ব্যক্তিদের দেয়া তালিকা চূড়ান্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের সততা, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং কৃষির সাথে  তাদের বাস্তব সম্পৃক্ততার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন সংসদ সদস্যরা।
তাঁদের অভিযোগ, সার ডিলার নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি উপকরণের ব্যবসার সাথে যুক্ত প্রকৃত ব্যবসায়ী এবং কৃষকদের সেবা দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে-এমন ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক গোলাম রসুল কয়েকজন ডিলারের নাম উল্লেখ করে তাদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, বাঘারপাড়া উপজেলার বাসুয়ারী ইউনিয়নের হাবিবুর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী হাবিবুর রহমানকে সার ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ব্যাংক ডাকাতি ও প্রতারণা সংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে দাবি করেন এই সংসদ সদস্য। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অভিযোগ ও মামলার বিষয় থাকা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তিকে সার ডিলার নিয়োগ দেয়ার ঘটনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। 

এ ছাড়া মনিরামপুর পৌরসভায় নাফিজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাসুদ পারভেজ রুবেলকে ডিলারশিপ দেয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক গোলাম রসুল। তিনি দাবি করেন, মাসুদ পারভেজ রুবেল উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির ছেলে। একই সাথে মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সালাউদ্দীনের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।

সংসদ সদস্যের এসব বক্তব্যের মাধ্যমে সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে, সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলার, প্রশাসন কিংবা কৃষি বিভাগের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে শুধু ডিলার নিয়োগ নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি গঠন নিয়েও আপত্তি জানান সংসদ সদস্যরা।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এসব কমিটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কৃষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণ না করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

সংসদ সদস্যদের দাবি, কৃষি খাতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের কমিটিতে নেয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, সার ও বীজের সরবরাহ, বিতরণ, বাজার পরিস্থিতি এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় এসব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ, অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তারা আরও বলেন, সার ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটি গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে প্রকৃত কৃষক ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সার কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সময়মতো এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছে দেয়া খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এ কারণে সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তাদের অভিযোগ, নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা ও অনিয়ম প্রাধান্য পেলে কৃষকদের প্রকৃত সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সাথে কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করেন তারা। 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য আজীজুর রহমান, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোসলেম উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলী, যশোর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর, সহ-সেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুস, জেলা প্রচার সেক্রেটারি অধ্যাপক শাহাবুদ্দীন বিশ্বাসসহ অনেকে। 

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: