জরাজীর্ণ ঘরে বুকে কোরআন আগলে ঘুমাতেন লায়লা, ফেসবুকে এক আহ্বানে বদলে গেল জীবন
বৃষ্টি হলেই ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ত। ভিজে যেত কোরআন শরিফও। স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিন নাতিকে নিয়ে জরাজীর্ণ ঘরে দিন কাটছিল ৭০ বছর বয়সী বিধবা লায়লা বেগমের। তাঁর দুরবস্থার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাত্র ৭২ ঘণ্টায় অনুদান মিলেছে ৯০ হাজার ১১৫ টাকা। এবার সেই অর্থে নির্মাণ করা হচ্ছে তাঁর নতুন ঘর।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পোড়াবাড়ীয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা লায়লা বেগম। প্রায় ১০ বছর আগে তাঁর স্বামী নেহাজ উদ্দিন মারা যান। কয়েক মাস আগে মারা যান একমাত্র ছেলে ফারুক। এরপর তিন নাতিকে নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন তিনি। বসবাসের ঘরটিও ছিল নড়বড়ে ও জরাজীর্ণ। বৃষ্টির পানি পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপনের পাশাপাশি ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেও সমস্যায় পড়তে হতো তাঁকে।
লায়লার এমন পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ভয়েস অব পাকুন্দিয়ার ক্রিয়েটর ও অ্যাডমিন এসএম রায়হান।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে ফেসবুকে লায়লার দুরবস্থার কথা তুলে ধরে নতুন ঘর নির্মাণে সহযোগিতা চান তিনি। এরপর দেশ-বিদেশে থাকা মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন। মাত্র তিন দিনে জমা হয় ৯০ হাজার ১১৫ টাকা। সেই অর্থে লায়লার জন্য নতুন ঘর ও শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুরে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ঘর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত হন।
এসএম রায়হান বলেন, লায়লার দুরবস্থার কথা প্রথমে তাঁকে জানান স্থানীয় বাসিন্দা মাসুম ও প্রবাসে থাকা রাসেল। তাঁদের কাছ থেকে বিষয়টি জানার পর ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। পরে সরেজমিনে ঘরটির অবস্থা দেখে আর দেরি না করে ফেসবুকে সহযোগিতার আবেদন জানান।
রায়হান বলেন, সামাজিক কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে আগে বিভিন্ন ধরনের বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়েছেন। সে কারণে প্রথমে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও লায়লার ঘরের অবস্থা দেখার পর আর পিছিয়ে আসেননি। মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়ে তিনি অভিভূত।
তিনি আরও বলেন, লায়লা নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন। বৃষ্টির পানি পড়ে তাঁর কোরআন শরিফ ভিজে যেত। এমন একজন অসহায় মানুষের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারা তাঁদের জন্য বড় প্রাপ্তি। ঘর ও শৌচাগার নির্মাণ শেষ করে লায়লার হাতে বুঝিয়ে দেওয়ার পর অনুদানের অর্থ কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা হবে।
নিজের দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে লায়লা বেগম বলেন, ঘরের মধ্যে খুবই কষ্ট। আমার কোরআন শরিফ ভিজে থাকত। আমি কোরআন শরিফ বুকে নিয়ে ঘুমাতাম। সকালে নামাজ পড়ে কোরআন পড়ি, আবার রাত ১২টার দিকেও পড়ি। আমার ঘরের যে এত কষ্ট, তা বলার মতো নয়।
নতুন ঘর নির্মাণের উদ্যোগে আনন্দ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আল্লাহর কাছে একটি ভালো ঘরের জন্য দোয়া করতেন। এখন ঘর নির্মাণ হচ্ছে, এতে তিনি খুব খুশি। যাঁরা এই কাজে সহযোগিতা করছেন, তাঁদের সবার জন্য নামাজ ও তাহাজ্জুদের সময় দোয়া করবেন বলেও জানান তিনি।
প্রতিবেশী আসাদ বলেন, স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে লায়লা দীর্ঘদিন ধরে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর ঘরটি ছিল একমাত্র আশ্রয়স্থল, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেটি মেরামত করাও সম্ভব হচ্ছিল না। প্রতিবেশীরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করলেও নতুন ঘর নির্মাণের সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। এ অবস্থায় রায়হানসহ যাঁরা এগিয়ে এসেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: