বইয়ের রাজ্য বাংলাবাজারে আছে ছাপাখানার শব্দ, নেই ছন্দ!
মেশিনের খটখট শব্দ, কাগজ-কালির মিশ্র গন্ধে মুখর রাজধানীর বাংলাবাজার। কোথাও বই ছাপার ব্যস্ততা, কোথাও কাটিং, বাঁধাই আর প্যাকেজিংয়ের ধুম।
সরু গলির দুই পাশে সারি সারি দোকান, ফুটপাত থেকে বহুতল মার্কেট— যেদিকে চোখ যায়, শুধু বই আর কাগজের স্তূপ। হকারের মাথায় বইয়ের বোঝা, ক্রেতার হাতে পছন্দের প্রকাশনা। দেখে মনে হবে, এ যেন বইয়ের এক বিশাল সাম্রাজ্য। যেখানে পাওয়া যায় নামিদামি লেখকদের যেকোনো বই। তাও আবার সুলভ মূল্যে।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, বইয়ের এই রাজ্যে ব্যস্ততার কমতি নেই। ছাপাখানার শব্দে মুখর গলিগুলোতে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজারো বই। তবে, এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে বদলে যাচ্ছে কিছু চেনা দৃশ্য। যে বাংলাবাজার একসময় দেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র ছিল, সেখানে এখন ক্রেতার অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় কাটছে বিক্রেতাদের। কমেছে বেচাকেনা, ম্লান হচ্ছে একসময়ের জমজমাট ব্যবসার ছন্দ।
স্থানীয়রা জানান, মুঘল আমলের আগেই পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল বাংলাবাজার। তবে বইয়ের বাজার হিসেবে এর বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। কলকাতানির্ভর প্রকাশনা শিল্পের বাইরে পূর্ব বাংলায় গড়ে উঠতে থাকে স্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। যার মাধ্যমে বাংলাবাজার পরিণত হয় প্রকাশনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে। সাহিত্যিকদের আড্ডা, নতুন বই প্রকাশ আর পাঠ্যবইয়ের ব্যবসায় জমে ওঠে বাজারটি।
সময়ের পালাবদলে টিনশেড দোকানের জায়গা নিয়েছে বহুতল মার্কেট। প্রকাশকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাবাজারে রয়েছে প্রায় চার হাজার বইয়ের দোকান। মুদ্রণ, বাঁধাই ও প্রকাশনাসহ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এক লাখেরও বেশি মানুষ। অথচ ব্যবসায়ীদের দাবি, আগের তুলনায় কেনাবেচা কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
কাগজের বাড়তি দাম, ছাপা ও বাঁধাইয়ের ব্যয় বৃদ্ধি, স্মার্টফোনে বই পড়ার প্রবণতা এবং অনলাইন বুকশপের বিস্তার— সব মিলিয়ে চাপে ঐতিহ্যবাহী এই বাজার। তবে বদলে যাওয়া এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার চেষ্টা থামেনি। অনেক ব্যবসায়ী এখন অনলাইনে বই বিক্রি করে পৌঁছে যাচ্ছেন দূর-দূরান্তের পাঠকের কাছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, একসময় একটি বইয়ের প্রথম সংস্করণে দেড় থেকে আড়াই হাজার কপি ছাপানো হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ কপিতে।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির পরিচালক আবুল বাশার ফিরোজ জানান, পুরান ঢাকার এই বাজারটি দেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহাসিক বই প্রকাশনা এবং বিক্রয়ের পাইকারি কেন্দ্র হিসেবে একসময় সমাদৃত থাকলেও এখন কিছুটা জৌলুস কমেছে। তবে এর জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে শত বছরের পুরোনো বাণিজ্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির এক দীর্ঘ বিবর্তন।
তবে বদলে যাওয়া এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার চেষ্টা থামেনি। অনেক দোকানই এখন অনলাইনে বই বিক্রি করছে, পৌঁছে যাচ্ছে দূর-দূরান্তের পাঠকের কাছে। বাংলাবাজারের গলিতে হয়তো কমেছে ক্রেতার পদচারণা, কিন্তু শতবর্ষী এই বইয়ের বাজার এখনো ধরে রেখেছে প্রকাশনা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বইয়ের এই ঐতিহাসিক জনপদ? সেই আশায় বুক বেঁধেছেন ব্যবসায়ীরা।
ছাপাখানার খটখট শব্দ এখনো থামেনি বাংলাবাজারে, বইয়ের গন্ধও হারিয়ে যায়নি। কিন্তু দেশের বইয়ের রাজধানী কি পারবে হারানো সেই বেচাকেনার সুদিন ফিরিয়ে আনতে?
বিভি/এমএ/পিএইচ













মন্তব্য করুন: