আলজাজিরা এক্সপ্লেইনার
বার্সেলোনায় ইয়ামালের রেকর্ড কি মেসির চেয়েও ভালো?
বার্সেলোনার ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত ড্রিবলিং, মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোলে সহায়তা এবং ম্যাচসেরার স্বীকৃতি—লামিনে ইয়ামাল যেন প্রতিটি ম্যাচেই নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। স্পেনের এই তরুণ ফরোয়ার্ডের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ ফুটবলপ্রেমীরা। একই সঙ্গে গোল ও গোলে সহায়তার পরিসংখ্যানে একের পর এক নজির গড়ে তুলছেন তিনি।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেকের পর থেকেই আলোচনায় ইয়ামাল। তবে চলতি মৌসুমে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নতুন করে সামনে এনেছে একটি প্রশ্ন- কিশোর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে পারফরম্যান্সের বিচারে কি লিওনেল মেসিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি?
চলতি মৌসুমের প্রথম আট সপ্তাহে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বার্সেলোনার হয়ে ১০ ম্যাচে আটটি গোল করেছেন ইয়ামাল। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও নয়টি গোল। অর্থাৎ, গোল ও গোলে সহায়তা মিলিয়ে তার অবদান ১৭টি।
অন্যদিকে, ২০০৮-০৯ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে প্রথম ১০ ম্যাচে আট গোল ও ছয়টি গোলে সহায়তা করেছিলেন মেসি। সব মিলিয়ে তার অবদান ছিল ১৪ গোলে। ওই মৌসুমেই প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
পরিসংখ্যানের হিসাবে একই সংখ্যক ম্যাচে মেসির চেয়ে তিনটি গোলে এগিয়ে ইয়ামাল। তবে এই তুলনা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। মেসির দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সঙ্গে ইয়ামালের সামগ্রিক অর্জনের তুলনা করার সময় এখনো আসেনি।
শুধু মেসি নন, একই সংখ্যক ম্যাচে গোল ও গোলে সহায়তার হিসাবে ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের চেয়েও এগিয়ে রয়েছেন ইয়ামাল।
২০১৭ সালে ১৮ বছর বয়সে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে (পিএসজি) যোগ দেন এমবাপ্পে। পরের বছর, ১৯ বছর বয়সে নিজের প্রথম ১০ ম্যাচে ১২টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছিলেন চারটি গোল। অর্থাৎ, গোল ও গোলে সহায়তা মিলিয়ে তার অবদান ছিল ১৬টি।
সেখানে ইয়ামালের অবদান ১৭ গোলে। ফলে প্রথম ১০ ম্যাচের পরিসংখ্যানে এমবাপ্পের চেয়ে এক গোলে এগিয়ে বার্সেলোনার এই তরুণ।
এদিকে, আসন্ন ব্যালন ডি’অর জয়ের স্বপ্নের কথাও জানিয়েছেন ইয়ামাল। তবে পুরস্কারটির দৌড়ে তাকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হতে পারে এমবাপ্পে ও ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কাছ থেকে।
২০২৪ সালে পিএসজি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এমবাপ্পে। স্প্যানিশ ক্লাবটির আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা তিনি। বার্সেলোনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদও ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে লড়াই করছে।
মেসির সঙ্গে ইয়ামালের তুলনা নতুন নয়। বার্সেলোনার জার্সিতে দুজনের অর্জন ও খেলার ধরনে মিল খুঁজে পান অনেক ফুটবলপ্রেমী। এবার পরিসংখ্যানেও সামনে এসেছে তাদের মধ্যে তুলনা করার মতো কিছু দিক।
লা লিগায় চলতি মৌসুমে টানা প্রথম পাঁচ ম্যাচে জোড়া গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ইয়ামাল। মেসিও ২০১২-১৩ মৌসুমে একই ধরনের কীর্তি গড়েছিলেন। তবে তখন তার বয়স ছিল ২৫ বছর।
মেসির সঙ্গে ইয়ামালের সম্পর্কের গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। ২০০৭ সালের এপ্রিলে গেতাফের বিপক্ষে নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের পাঁচ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বিখ্যাত একক প্রচেষ্টার গোল করেছিলেন মেসি। বার্সেলোনার তৎকালীন মাঠ ন্যু ক্যাম্পে সেই গোল মুগ্ধ করেছিল দর্শকদের।
এর তিন মাস পর জন্ম হয় ইয়ামালের। একই বছর বার্সেলোনার মাঠে ইউনিসেফের তহবিল সংগ্রহের একটি ফটোশুটে পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ২০ বছর বয়সী মেসির। সেই সময়ের একটি ছবি চলতি বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। প্রথমে অনেকে ছবিটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে সন্দেহ করলেও এটি ছিল বাস্তব ঘটনা।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর দুই তারকা মুখোমুখি হন বিশ্বকাপের ফাইনালে। ১৯ জুলাইয়ের সেই ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জেতে ইয়ামালের স্পেন। ম্যাচ শেষে দুই তারকাকে উষ্ণ আলিঙ্গন বিনিময় করতেও দেখা যায়।
পরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ফাইনালে মেসিকে কী বলেছিলেন, তা প্রকাশ করেন ইয়ামাল। যুক্তরাজ্যের একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘ফুটবলকে আপনি যা দিয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছি।’
ফাইনালের আগে ৩৯ বছর বয়সী মেসি ও ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের লড়াইকে অনেকেই অভিজ্ঞ গুরুর সঙ্গে তার উত্তরসূরির দ্বৈরথ হিসেবে দেখেছিলেন। এখন বার্সেলোনার হয়ে মেসির বিভিন্ন মাইলফলকের কাছাকাছি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছেন ইয়ামাল।
ইয়ামালের দুর্দান্ত ফর্মের প্রভাব পড়েছে লা লিগার পরিসংখ্যানেও। চলতি মৌসুমে লিগে তাঁর ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা সাত। যা ভ্যালেন্সিয়ার ছয় গোল এবং গেতাফে ও মালাগার চারটি করে গোলের চেয়ে বেশি।
তরুণ এই ফরোয়ার্ডের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ বার্সেলোনার কোচ হান্সি ফ্লিকও। ইস্তাম্বুলে গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ের পর ইয়ামালের প্রশংসা করেন তিনি।
ফ্লিক বলেন, ‘প্রতিটি অনুশীলনে লামিনে যেভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করে, ম্যাচেও ঠিক একইভাবে করে। আমার দলে অনেক বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছে। সবাই লামিনের দিকে তাকিয়ে আছে—এটাই স্বাভাবিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমন খেলোয়াড় দলে থাকা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সে আমাদের ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে।’
পরিসংখ্যানের বিচারে ইয়ামাল এখনই মেসি ও এমবাপ্পের সঙ্গে তুলনায় জায়গা করে নিয়েছেন। তবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কতটা সাফল্য অর্জন করেন, সেটিই হবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আপাতত বার্সেলোনার সমর্থকদের প্রত্যাশা, এই তরুণ প্রতিভা একদিন ক্লাবটির ইতিহাসে নিজের জন্যও তৈরি করবেন অনন্য এক অধ্যায়।
সূত্র: আলজাজিরা
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: