দেলদুয়ারে ‘সিডলেস’ লেবুর বিপ্লব, কৃষকের ঘরে সচ্ছলতা
টাঙ্গাইলের দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠে এখন সবুজের সমারোহ। তবে এই সবুজ শুধু ধান বা পাটের নয়, এটি লেবু বাগানের। দিন দিন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাড়ছে লেবুর আবাদ। বিশেষ করে জেলার দেলদুয়ার উপজেলার ‘সিডলেস’ (বীজহীন) লেবুর সুখ্যাতি ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। অল্প পরিশ্রমে ও কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী ফসল ছেড়ে লেবু চাষে ঝুঁকছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। বাগানের লেবুর সুগন্ধে কৃষকের ঘরে আসছে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, অনেকেই বুনছেন লাখপতি থেকে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে দেলদুয়ার উপজেলার, বিশেষ করে লাউহাটী এলাকার সিডলেস লেবু। ভেতরে কোনো বীজ বা বিচি না থাকা, প্রচুর রস এবং মন মাতানো সুঘ্রাণের কারণে বাজারে এই লেবুর কদর সবচেয়ে বেশি।
লেবু চাষে খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না, রোগবালাইও তুলনামূলক কম। একবার গাছ লাগালে দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায়। রমজান মাসে ভালো দাম পেয়ে কৃষকরা দারুণ খুশি। বর্তমানে বাজারে কিছুটা মন্দা থাকলেও পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই লেবু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন, ফলে কৃষকদের পরিবহনের ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না।
উপজেলার বিভিন্ন বাগানে ঘুরে দেখা যায় কৃষকদের ব্যস্ততা ও উচ্ছ্বাস। দীর্ঘ ৭ বছর ধরে লেবু চাষের সাথে যুক্ত কৃষক ফারুক হোসেন। নিজের সফলতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ৩০০ ডেসিমাল (শতাংশ) জমিতে লেবুর আবাদ করছি। নতুন করে আরও ৫০ ডেসিমাল জমিতে চারা লাগিয়েছি। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ ৩০০ ডেসিমালে আমার বছরে খরচ হয় প্রায় ৩ লাখ টাকা। আর এই জমি থেকেই বছরে আমি প্রায় ৭ লাখ টাকার লেবু বিক্রি করি।’
একই এলাকার আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম। তার কণ্ঠেও সফলতার সুর। তিনি বলেন, ‘আমি ৩০০ থেকে ৩৫০ ডেসিমাল জায়গায় লেবুর আবাদ করেছি। বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা খরচ হলেও লেবু বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার। অন্যান্য যেকোনো ফসলের তুলনায় লেবু চাষে আয় অনেক বেশি, এটি অত্যন্ত লাভজনক।’
ধান ও পাটের বদলে কেন লেবু চাষ-এমন প্রশ্নের জবাবে কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমি আগে ধান আর পাটের আবাদ করতাম, কিন্তু ওটায় খুব একটা লাভ হয় না। সিডলেস লেবুর প্রচুর চাহিদা। ব্যাপারীরা সরাসরি বাগানে এসে লেবু দেখে কিনে নেয়। ভেতরে বিচি না থাকায় এর কদর বেশি। আমাদের এখানকার লেবু ঢাকা তো যায়ই, অনেক দূরেও যায়। বিদেশেও এর চাহিদা আছে। এই কারণেই আমরা এখন লেবু চাষ করি।’
স্থানীয় আরেক কৃষক সোলায়মান মিয়া জানান, ‘আমাদের এলাকায় এখন বেশ উন্নত পদ্ধতিতে লেবুর চাষাবাদ হচ্ছে। ফলনে কোনো ঘাটতি নেই। অন্যান্য আবাদের চেয়ে এই আবাদটা অনেক ভালো এবং নিরাপদ।’
দেলদুয়ার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল হাসান জানান, ‘দেলদুয়ার উপজেলা লেবুর জন্য একটি বিখ্যাত এলাকা। বর্তমানে এ উপজেলায় ২২০ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ হচ্ছে। আমরা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ সেবা দিয়ে আসছি।’
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত নতুন জাত- ‘বিনা লেবু-১’ এবং ‘বিনা লেবু-২’ কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উন্নত জাতের চারা দিয়ে ইতিমধ্যে ১৫টি প্রদর্শনমূলক লেবু বাগান স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও রোগবালাই দমন, আন্তঃপরিচর্যা এবং বিপণন (মার্কেটিং) বিষয়ে কৃষি অফিস সার্বক্ষণিকভাবে লেবু চাষিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
দেলদুয়ারের মাটি ও আবহাওয়া সিডলেস লেবু আবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার কৃষকদের আগ্রহ এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় লেবুর উৎপাদন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারিভাবে আরও উন্নত পৃষ্ঠপোষকতা ও রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা গেলে এ অঞ্চলের লেবু বিদেশে রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। লেবুর ঘ্রাণেই হয়তো একদিন বদলে যাবে পুরো টাঙ্গাইলের গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।
বিভি/এআই













মন্তব্য করুন: