• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসছে সুখবর, শিথিল হতে পারে বিধিনিষেধ!

কেফায়েত শাকিল ও নিয়াজ মাখদুম

প্রকাশিত: ১৯:৫৬, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসছে সুখবর, শিথিল হতে পারে বিধিনিষেধ!

শিথিল হতে যাচ্ছে সেন্টমার্টিনের বিধিনিষেধ। পর্যটন ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে দ্বীপে রাত্রীযাপনের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার।

সম্প্রতি বাংলাভিশনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেন্টমার্টিনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কথা বলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। এ সময় তিনি সেন্টমার্টিন ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টার নেওয়া কঠোর সিদ্ধান্তকে অতি আবেগী বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কথা ভাবা হয়নি। 

তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনে ভিজিট নিয়ে যে প্রজ্ঞাপন আছে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি থেকে এটা করা হয়েছে। প্র্যাকটিক্যালি জিনিসটাকে আমলে নেওয়া হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে, ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি দুই মাস রাতে অবস্থানের সুযোগ দিয়েছে, নভেম্বরে দেয়নি। আমি হয়তো মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলে, ওই সিজন আসার আগেই একটা সিদ্ধান্ত নেব। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে, তাদের যে দাবি সেটা অনেকটা যৌক্তিক।

সেন্টমার্টিনকে ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর সব যেমন যৌক্তিক নয়, অনেকগুলো আবারও অযৌক্তিকও নয় বলে মনে করেন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী। তাই বর্তমান সরকার পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে বলেও জানান তিনি।

শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, এখন যেটা আছে সেটা অযৌক্তিক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার যৌক্তিকও। যেটা যৌক্তিক সেটা থাকবে। যেটা অযৌক্তিক সেটাকে আমরা কমিয়ে আনার চেষ্টা করবো। ওখানকার মানুষেরা দুই-তিন মাস ইনকাম করে এবং সারা বছর ওটা দিয়েই চলে। এখানকার পর্যটন শিল্প বা আমাদের ইকোটুরিজম যেটা আছে সেটা দিয়েই তারা চলতেছে। বিষয় হলো, ওই দ্বীপটির কতটুকু সক্ষমতা আছে বা কতটুকু আমাদের করা উচিত-সেইগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট যারা স্টেক হোল্ডার আছেন ইভেন যারা সাংবাদিক আছেন, যারা পরিবেশকর্মী আছেন-সবাইকে নিয়ে বসে আলাপ আলোচনা করার চেষ্টা করব। একটা যৌক্তিক সমাধানে আসা যায়, সেই চেষ্টা থাকবে। 

সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন চালু রেখেই সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করা যাবে দাবি করে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটা জাহাজ যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে—দুই ঘণ্টা থাকলো না এক রাত বেশি থাকলো, এটা গুরুত্বপূর্ণ না। আপনি মেইনটেন্যান্স করতে পারছেন না বা আপনার সক্ষমতা নেই, সেটার জন্য তো ভিজিটরদের মুক্ত করে দিতে পারেন না। রাষ্ট্রের হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়াতে হবে, সবাইকে ডিসিপ্লিনের মধ্যে আনতে হবে। সবার মধ্যে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও পরিবেশের প্রতি আনুগত্য তৈরি করতে হবে। আমি মনে করি, এটা নিয়ে কাজ করলে সঠিক উদ্যোগ হবে। আবেগ-অনুভূতির চেয়ে বাস্তবতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আগামী সিজনের আগেই আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করব।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তকে আবেগী বলতে নারাজ পরিবেশবাদীরা। পর্যটকদের উন্মুক্ত ছেড়ে দিলে দ্বীপটি আবারও সংকটের মুখে পড়বে দাবি করে সেভ আওয়ার সি-এর নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, বাংলাদেশে বলা যায়, একমাত্র কোরাল আইল্যান্ড সেন্টমার্টিন। এখানে বায়োডাইভার্সিটি ও ইকোলজি একটা বড় ইস্যু। যেখানে কোরাল থাকে, সেখানকার পানি স্বচ্ছ থাকে এবং অন্যান্য মাছের মিটিং, ব্রিডিংসহ অনেক বিষয় ভালোভাবে হয়। বাংলাদেশের জন্য এটা আসলে বড় একটা আশীর্বাদ যে, সেন্টমার্টিনের মতো একটা জায়গা আছে। যেখানে পানি স্বচ্ছ থাকে, মানুষ যেতে পারে বা ট্যুরিজম করতে পারে। এই ট্যুরিজমটা মূলত হওয়া দরকার আন্ডারওয়াটার ট্যুরিজম। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সেখানে গিয়ে কী করে? সেখানে গিয়ে তারা ছবি তুলবে, বিচে বাইক চালাবে, তিন চাকাওয়ালা জিনিস চালাবে। ওখানকার সি-টার্টেলসহ নানান ধরনের প্রাণীর জীববৈচিত্র্য নষ্ট করবে। মূলত একটা কোরাল আইল্যান্ডে যে ধরনের ট্যুরিজম হওয়ার কথা, সেই ট্যুরিজম এখানে হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, যদি এমপিএ, ইসিএ-এর যে বিষয়গুলো আছে, পরিবেশ রক্ষার জন্য সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে এবং সেটা মেনে যদি কোনো ট্যুরিজম করা যায়, আমরা তো সেটা সাপোর্ট করতেই পারি। কিন্তু আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। আমরা সেখানে গিয়ে ডেস্ট্রাক্টিভ ট্যুরিজম করছি। এ কারণে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিবেশ উপদেষ্টা যে কাজটা করেছেন, সেটা পুরোপুরি ঠিক না হলেও একদম যে বেঠিক হয়েছে তা না। তিনি প্রথমে এটা বন্ধ করেছেন—আগে বন্ধ করো, পরিবেশটাকে ঠিকমতো ব্লুমিং হতে দাও। সেখানে ক্যারিং ক্যাপাসিটির বিষয়টা নিয়ে এসেছেন। এখন আপনি এটাকে সিস্টেমেটিক ওয়েতে আস্তে আস্তে ওপেন করতে পারেন। কিন্তু ওই দ্বীপে যেভাবে ট্যুরিজম করা যায়, এমপিএ মেনে সেই ট্যুরিজম এখানে করা দরকার।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, সেন্টমার্টিনের সমুদ্রতলে ৯৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৩৫ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল ও ঘাষ এবং প্রায় ২৫০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের অভয়ারণ্য ও প্রজনন ক্ষেত্র রয়েছে। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ পাখি ও কচ্ছপের বসবাস ও ডিম পাড়ার স্থান এই দ্বীপ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের মাধ্যমে সীমাহীন পরিবেশ দূষণের কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য চরমভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার। আইন অনুযায়ী পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কোনো স্থাপনা তৈরিসহ পরিবেশ বিপর্যয়কারী কার্যক্রম ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই সেখানে চলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন। পরে ২০২২ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিকটবর্তী সামুদ্রিক এলাকাকেও মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া ঘোষণা করা হয়। দেওয়া হয় নানান বিধিনিষেধ। এসব বিধিনিষেধেও কোনো সুফল না পেয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবরে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেন্টমার্টিনে দিনে ২ হাজারে বেশি পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং শুধু ডিসেম্বর ও জানুয়ারী মাস ছাড়া অন্য সময় দ্বীপে রাত্রীযাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার।
 

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত