টাঙ্গাইলে সূর্যমুখীর হাসি, কৃষকের মুখে স্বস্তির আলো
ভোরের আলো ফুটতেই টাঙ্গাইলের যমুনা তীরে এখন দেখা মেলে সোনালি আভা। তবে এ আলো কেবল সূর্যের নয়; যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও মাঠজুড়ে ফুটে থাকা হাজারো সূর্যমুখীর। টাঙ্গাইল সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এবার সূর্যমুখীর বাম্পার ফলন হয়েছে। কম খরচে অধিক লাভ এবং তেলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় কৃষকদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নসহ যমুনার তীরবর্তী এলাকাগুলোতে এখন হলুদ আর সবুজের মিতালী। সবুজ পাতার আড়াল ভেদ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলগুলো যেন অভিবাদন জানাচ্ছে নতুন দিনকে। ফুলের বাগানে সারাদিন চলে মৌমাছি আর প্রজাপতির মেলা। এই নয়নজুড়ানো দৃশ্য কেবল কৃষকের স্বপ্নই নয়, বিনোদনপ্রেমীদের কাছেও হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ।
কৃষক রহমত মিয়া বলেন, আগে ধান বা অন্য আবাদ করতাম, খরচ খুব বেশি ছিল। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে সূর্যমুখী লাগিয়েছি। খরচ অনেক কম কিন্তু তেলের যে দাম, তাতে কয়েকগুণ লাভের আশা করছি। আমার দেখাদেখি পাশের অনেকেই আগামী বছর সূর্যমুখী চাষের কথা ভাবছে।
প্রান্তিক কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, "আগে ভাবতাম সূর্যমুখী শুধু শৌখিন ফুল। কৃষি অফিসের স্যারদের কথামতো এবার ১ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। যে ফলন দেখছি, তাতে তেলের চাহিদা মিটিয়ে ভালো টাকা হাতে আসবে বলে আশা করছি।"
কৃষক হাতেম আলী বলেন, ধান বা পাটে অনেক পানি আর সার লাগে, খরচ পোষাতে হিমশিম খাই। কিন্তু সূর্যমুখীতে পানি কম লাগে, পোকাও কম ধরে। বাজারে এই তেলের অনেক চাহিদা, তাই আগামীতে আরও বড় পরিসরে করার ইচ্ছা আছে।"
দর্শনার্থী তানিয়া আক্তার বলেন, "ফেসবুকে ছবি দেখে যমুনার পাড়ে এসেছি। চারদিকে এত হলুদ ফুল দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। যমুনার তীরে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের মানসিকভাবে খুব প্রশান্তি দিচ্ছে।"
কলেজছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, আমরা বন্ধুরা মিলে সদরের এই চরে এসেছি ছবি তুলতে। আগে জানতাম না এখানে এত সুন্দর সূর্যমুখীর চাষ হয়। যমুনার খোলা বাতাস আর এই হলুদ ফুলের বাগান মন ভালো করে দেওয়ার মতো এক অদ্ভুত দৃশ্য।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান বলেন, শহরের যান্ত্রিকতা ছেড়ে বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি একটু বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য। টাঙ্গাইলের এই কৃষি পর্যটন সত্যিই প্রশংসনীয়।"
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, সরিষার বিকল্প এবং স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে সূর্যমুখী চাষ মাইলফলক হতে পারে। কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর হাত ধরে টাঙ্গাইলের কৃষিতে আধুনিকায়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এবং এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা কৃষি অফিসার রুমানা আক্তার বলেন, এবার টাঙ্গাইল সদরে প্রায় ২৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। আমরা কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত মানের বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করছি। সূর্যমুখী চাষ একদিকে যেমন ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি পর্যটনের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ অব্যাহত থাকলে এটি জেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেবে।"
সারা বছর টাঙ্গাইলে নানা ফসলের আবাদ হলেও, সূর্যমুখী এখন নতুন সম্ভাবনা। সরকারি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা আর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে এই সোনালি ফুলই হয়ে উঠবে টাঙ্গাইলের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি।
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: