চাঁপাইনবাবগঞ্জে চোখ রাঙাচ্ছে হাম, ৩ মাসে চার শিশুর মৃত্যু
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ হাম প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত তিন মাসে এ রোগে চার শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে জেলায় ছয় শতাধিক শিশু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জেলা হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে চরম চাপ। আইসিইউ সুবিধা না থাকা, শয্যা সংকট এবং চিকিৎসক-নার্সের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জানা গেছে, প্রতিদিনই জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের কিডনি ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডকে অস্থায়ী আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে প্রায় শতাধিক রোগীকে গাদাগাদি করে, অনেক ক্ষেত্রে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবুও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক রোগীকে বারান্দা ও সিঁড়ির নিচে অবস্থান করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আইসোলেশন ওয়ার্ডে পা রাখার মতো জায়গা নেই। সংক্রামক রোগ হওয়া সত্ত্বেও রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে স্বাস্থ্যবিধি মানা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের স্বজন খাতিজা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাসপাতালে কোনো বেড নেই। বাচ্চাকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। খুব কষ্টে আছি।
আরেকজন স্বজন আঁখি আক্তার বলেন, কিছু ওষুধ দেয়, কিন্তু বেশিরভাগই বাইরে থেকে কিনতে হয়। গরিব মানুষের জন্য এটা অনেক কঠিন।
অপর এক অভিভাবক খালেদ মাহমুদ বলেন, হাম ছোঁয়াচে রোগ, কিন্তু এখানে সবাই গাদাগাদি করে আছে। এতে তো আরও বেশি ছড়াবে।
আরেকজন অভিযোগ করেন, চিকিৎসকরা চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু নার্সদের আচরণ ভালো না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারও অভাব রয়েছে।
এদিকে, হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জেলা হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু টিকা গ্রহণে অনীহার কারণে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, হাসপাতালে হাম রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে রোগটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে।
জেলার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দিন বলেন, হাম প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করে তাদের টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। জেলা সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলায় রোগটির প্রাদুর্ভাব বেশি।
চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে দ্রুত ছড়ায়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬০০ শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ।
বিভি/এসজি



মন্তব্য করুন: