অপ্রতিমের পরিবারকে হুমকি: জিডির দাবি বাবার, ভিন্ন কথা ওসির, এড়িয়ে গেলেন তদন্ত কর্মকর্তা
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার। এ ঘটনায় থানায় অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার দাবি করেছেন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। তবে সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেছেন, হত্যা মামলা হওয়ার পর অপ্রতিমের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো জিডি বা অভিযোগ থানায় পাওয়া যায়নি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) অপ্রতিমের বাবা ও পুলিশের সঙ্গে কথা হয় বাংলাভিশনের প্রতিনিধির। সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অপ্রতিম হত্যার পরে একটি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলার পরে কোনো জিডি কিংবা অভিযোগ আমার থানায় পাইনি। মামলা হওয়ার পরে অন্য কোনো জিডি বা অভিযোগ—কোনো কিছু হয়নি। হলে আমরা আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেব।’
অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে একটি গ্রামীণফোন নম্বর থেকে তার মোবাইলে কল আসে। পরিচয় জানতে চাওয়ার পর নিজের পরিচয় দিলে অপর প্রান্ত থেকে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন আসে, কিন্তু পরিচয় দেয় না। সেদিন ফোন করে খুব খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করেছে।’
থানায় জিডি বা অভিযোগের বিষয়ে কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘পুলিশ আমার বাসায় আসছে। তখনও এই বিষয় ইনফর্ম করেছি। আজ সকালে ওসি আমাকে ফোন করেছে। আমি বিষয়টি ইনফর্ম করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলের নামে অসংখ্য আইডি খুলছে। টিকটক আইডি, ফেসবুক আইডি ও আমার স্ত্রীর নামে প্রায় ১২-১৩টা আইডি—এইগুলো নিয়ে থানায় গিয়েছিলাম। ওখানে অনলাইনে একটি জিডি করা হয়েছে। পরশুদিন জিডি করেছিলাম। ২১ তারিখ হুমকি দেওয়ার পরে থানায় গিয়ে অনলাইনে জিডি করেছি।’
অপ্রতিমের বাবা আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ফেসবুক আইডি খুলে অপ্রতিম ও তার মাকে জড়িয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন নম্বর থেকে তাদের মোবাইলে ফোন করে অশোভন আচরণ করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
এ বিষয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও অপ্রতিম হত্যা মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘আমি এক মিনিট পরে ফোন দিচ্ছি।’ এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। পরে ফোন না দেওয়ায় প্রায় আধা ঘণ্টা পর প্রতিবেদক আবার যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমি একটু ব্যস্ত হয়ে গেছি। এই বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি সাহেবকে ফোন দেন। এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারতেছি না।’ এরপর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। সে বর্ডার গার্ড হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। ওই দিন তার বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন তার বাবা।
পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ ও অপ্রতিমের মুঠোফোনের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসানকে (১৬) এবং জড়িত সন্দেহে মো. সিয়ামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য অপ্রতিমের মাথায় বাঁশ ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। পরে তার মুঠোফোন নিয়ে পালিয়ে যায় ওই তিনজন। ওই দিন সিয়াম ছাড়া গ্রেপ্তার অপর তিনজন কুমিল্লার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আদালতের আদেশে ফাহাদ ও কামরুলকে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। অপর দুই আসামি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে।
এদিকে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান জানান, অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। এসআই সাইফুল ইসলামের পরিবর্তে সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব আহমেদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: