• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আইএমএফ’র ঋণ কর্মসূচিতে কী আছে, কিস্তি পাওয়া নিয়ে সংকট কেন?

প্রকাশিত: ১৯:২৫, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

ফন্ট সাইজ
আইএমএফ’র ঋণ কর্মসূচিতে কী আছে, কিস্তি পাওয়া নিয়ে সংকট কেন?

আইএমএফ'র সাথে বাংলাদেশের এই ঋণ চুক্তি নতুন নয়। ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চার দশমিক সাত বিলিয়ন বা ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই করে বাংলাদেশ।

২০২৪ সালের অগাস্টে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ওই সময় ঋণের পরিমাণ আরও ৮০০ মিলিয়ন ডলার বাড়ানো হয়। তখন ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার।

এই অর্থের মধ্যে এখন পর্যন্ত আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ ছাড় করেছে তিন দশমিক ৬৪ বিলিয়ন বা ৩৬৪ কোটি ডলার।

গত ডিসেম্বরে ঋণের আরেক কিস্তি অর্থ পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু তখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণের অর্থ ছাড় করেনি আইএমএফ। তারা চেয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে নির্বাচিত সরকারের সাথে আলোচনা করেই এই অর্থ ছাড় করা হবে।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পর ১৭ই ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। ওই বকেয়া কিস্তিসহ চলতি বছরের জুনের মধ্যে এক দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার ঋণ আশা করেছিল বাংলাদেশ।

তবে শুক্রবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন জানান, এ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং পরবর্তীতে আপডেট জানানো হবে।

ঋণ ছাড়ের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়নি সেটি বৈঠক শেষে জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলও।

একই দিন বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, "এখনো আমাদের আলোচনা চলছে। যে বিষয়গুলো এখনো মীমাংসা হয়নি, এগুলো আগামী দিনে আলোচনার মধ্যে আসবে। এটাই পরিষ্কার সিদ্ধান্ত"।

ঋণের কিস্তি পাওয়া নিয়ে সংকট কেন?
আইএমএফ'র ঋণ সহযোগিতা পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা আছে সেটা আইএমএফ ও বাংলাদেশ উভয়পক্ষের বক্তব্যে অন্তত স্পষ্ট।

ঋণ চুক্তির আওতায় রাজস্বখাত সংস্কার, ব্যাংকখাত সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করাসহ বেশ কিছু শর্ত ছিল।

কিন্তু এমন অবস্থায় চলমান ঋণচুক্তির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি রিভিউ (পর্যালোচনা) না করে ঋণের কিস্তি ছাড় করার ব্যাপারে তারা আগ্রহী নয় বলেও মনে করেন বিশ্লেষক। আইএমএফ বলছে, কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পেতে সংস্কার কার্যক্রম এগ্রিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশকে।

শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফ'র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেছেন, "বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার বিশ্বের সর্বনিম্নের মধ্যে একটি এবং গত তিন বছরে তা আরও কমেছে"।

তিনি আরও জানান, "আইএমএফ'র ঋণ কর্মসূচিতে তিনটি বিষয় রয়েছে। তা হলো- রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাত পুনরুদ্ধার এবং বিনিময় হার সংস্কার। এখনো তার প্রতিটিতেই কাজ বাকি রয়েছে"। তবে, এই বিষয়ে আর খোলাসা করে তিনি বলেননি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে যে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও যেমন পূরণ হয়নি, সেই সাথে আইএমএফর কাছে যে প্রতিশ্রুতি ছিল তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়, রাজস্ব আদায়, কিংবা ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে হয়তো কিছু প্রশ্ন রয়েছে আইএমএফ'র।

জাহিদ হোসেন বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশে ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ ছিল না। কিন্তু নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আইনে' ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে সেই অবস্থান বদলে দেওয়া হয়েছে"।

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই ধারাটি যুক্ত করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, ব্যাংক খাতে সংস্কারের আইএমএফ'র যে সব শর্ত ছিল তার একটি ছিল এটি। ফলে এই ১৮ এর 'ক' ধারাটি যুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, "এই রেজুলেশন, সংস্কার বা অধ্যাদেশ এগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক একা করেনি। এর সাথে তখন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফও জড়িত ছিল। পরবর্তী ঋণ ছাড়ের জন্য তো এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সেই সংস্কার তো টিকলো না"।

ওয়াশিংটনে সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের জন্য সংকটের বিষয়গুলোও গুরুত্ব দেন মি. শ্রীনিবাসন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফ'র সাথে বাংলাদেশের ঋণ নিয়ে যে সমঝোতা ছিল, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা শর্ত ছিল বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানো। অন্যটা ছিল রাজস্ব আদায়।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, "কথা ছিল বিদ্যুতে ভর্তুকি কমানো হবে। সেটা তো করা হয়নি। তাদের আরেকটা ক্রাইটেরিয়া ছিল রেভিনিউ বা রাজস্ব আদায়, সেটিও অর্জিত হয়নি। সুতারং এই জায়গাগুলোতে প্রগেস না হওয়াটা আরেকটা বড় কারণ"।

এখনো আশাবাদী বাংলাদেশ
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং একটি বিবৃতি পাঠিয়েছে গণমাধ্যমে। এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, "বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকের ফাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছে।

বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বিএনপি সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ব্যাংক-আর্থিক খাতে সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অধিকাংশ বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে"।

এতে আরো বলা হয়, কিছু বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করতে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে। আর কিছু ক্ষেত্রে দুই পক্ষ একমত হয়নি।

ওয়াশিংটনের ওই বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "এটা বুঝতে হবে বিষয়গুলো একটা চলমান প্রক্রিয়া। এটা কোন একদিনের সিদ্ধান্ত না বা এক ঘণ্টার সিদ্ধান্ত না। আলোচনা চলতেই থাকবে। এবং আলোচনা যত যেতে থাকবে এর মধ্যে একটা সমাধান হবে"।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত