• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

শিক্ষকদের সমন্বয়হীনতায় ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত, ক্ষমা চাইতে হলো শিক্ষার্থীদের

মেহেদি হাসান, ঢাবি প্রতিনিধি 

প্রকাশিত: ১৭:৩৭, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

আপডেট: ১৭:৩৮, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

ফন্ট সাইজ
শিক্ষকদের সমন্বয়হীনতায় ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত, ক্ষমা চাইতে হলো শিক্ষার্থীদের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ৪র্থ বর্ষ সপ্তম সিমেস্টারের একটি কোর্স ECON-409 (Environmental Economics) এর ফাইনাল পরীক্ষা ছিলো ১৩ জুন । কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পঠিত সিলেবাসের সাথে প্রণীত প্রশ্নের কোন রকম সামঞ্জস্য না থাকায় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানায় । 

সেদিন পরীক্ষার হলে কর্তব্যরত প্রত্যাবেক্ষক তাহিয়া আনান ধীরা পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ নাইমুল ওয়াদুদকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি পরীক্ষাটি স্থগিত ঘোষণা করেন। তারপর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হল ত্যাগ করে বলে নিশ্চিত করেন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাইমুল ওয়াদুদ। 

তিন মাসের অধিক সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও অবধি স্থগিত করা পরীক্ষাটি নেয়ার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে ১০৬ জন শিক্ষার্থীর পরবর্তী শ্রেণির কার্যক্রম ও সরকারি-বেসরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার বিষয়গুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 

ইকোন-৪০৯ কোর্সটি পড়িয়েছেন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার। এ বছরের ৪ এপ্রিল অর্থনীতি বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় বিভাগের চেয়ারম্যান মাহবুবুল মোকাদ্দেম ওরফে এম এম আকাশ জানান, অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার তার কোর্সের সিলেবাস শেষ করেছেন এবং আর্লি রিটায়ারমেন্টের আবেদন করেছেন।  

৪০৯ এর পরিবর্তে অন্য সিলেবাস অনুসরণ করে শ্রেণিকক্ষে পড়িয়েছেন কিনা জানতে চাইলে অধ্যাপক খন্দকার এই প্রতিবেদককে বলেন, "আমি সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি জাতিসংঘ সিস্টেম থেকে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় পড়িয়েছি।” 

"কেউ যদি আমার টিচিং মেথডকে চ্যালেঞ্জ করে তাহলে আমি এনভায়রনমেন্টাল ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক স্কলারদের মাধ্যমে আমার স্ক্রিপ্ট মূল্যায়িত করতে রাজি আছি।”

শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির জন্য ব্যক্তিগতভাবে দুঃখপ্রকাশ করে অধ্যাপক খন্দকার বলেন, "পরীক্ষা কমিটি কেন আমার কাছে প্রশ্নপত্র চাইলো না সেটাই বরং বিস্ময়কর। আমার কাছে প্রশ্ন প্রস্তুত করাই ছিলো। আমি সিলেবাস পড়িয়েছি অথচ তারা নিজেদের মতো করে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছে।”

তার নেয়া মাস্টার্সের ৫১৯ নং কোর্সে কোন ঝামেলা হয় নি দাবি করে অধ্যাপক খন্দকার বলেন, "কারণ মাস্টার্সের ওই কোর্সের পরীক্ষা কমিটি আমার কাছ থেকে প্রশ্নপত্র নিয়েছিলো ফাইনাল পরীক্ষার।” 

জানা গেছে, অনার্স ৪র্থ বর্ষের এই পরীক্ষা কমিটি ছিলো তিন সদস্যবিশিষ্ট । চেয়ারম্যান সৈয়দ নাইমুল ওয়াদুদ বাদে বাকি দুজন সদস্য হলেন অধ্যাপক মাসুদা ইয়াসমিন এবং অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা । সায়েমা হক বিদিশার কাছে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সহযোগী অধ্যাপক নাইমুল ওয়াদুদের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন ।

এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরিতে অধ্যাপক মাসুদা ইয়াসমিনের ফোন নম্বর ও সচল ইমেইল ঠিকানা না থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

স্থগিত ঘোষণা হওয়া পরীক্ষার প্রশ্নকর্তা তাহিয়া আনান ধীরা বিভাগের চেয়ারম্যান মাহবুবুল মোকাদ্দেমের কাছে লিখিত বক্তব্যে জানান, "উল্লেখিত কোর্সটির প্রশ্ন করণের চিঠি পাওয়া মাত্র আমি পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ড. সৈয়দ নাইমুল ওয়াদুদ স্যারকে জিজ্ঞেস করি আমি কীভাবে প্রশ্ন করব, যেহেতু আমি পাঠদান করিনি।”

প্রভাষক ধীরা আরো জানান, "তিনি (সহযোগী অধ্যাপক ওয়াদুদ) বলেন, যেহেতু আমি এই কোর্সটি বিগত দুই বছর পড়িয়েছি, সিলেবাস দেখে এই বিষয়ে বহু পঠিত টপিকগুলো নিয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড প্রশ্ন করতে যাতে সব ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিতে পারে। আমি এই নির্দেশ মেনে সেভাবেই প্রশ্নটি করি।”

এদিকে ২৮ আগস্ট পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর পাঠানো চিঠিতে চেয়ারম্যান মাহবুবুল মোকাদ্দেম লিখেন, "পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত না হওয়ার জন্য প্রকৃতপক্ষে ছাত্রদের কোন দোষ নেই বলে বিভাগের একাডেমিক কমিটি (২৫ আগস্টের মিটিং) একমত হয়েছে।” 

অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক মোকাদ্দেম পরবর্তীসময়ে চতুর্থ বর্ষের বেশ কিছু শিক্ষার্থীর কাছে রীতিমতো হুমকি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ফরমেটের পত্রে স্বাক্ষর নেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর লেখা সেই পত্রে কয়েকটি লাইন ছিলো নিম্নরুপ, "প্রশ্নপত্রটির সাথে আমাদের শ্রেণি পাঠের কোন মিল না থাকায় আমরা সেদিন পরীক্ষা না দিয়েই হল পরিত্যাগ করেছিলাম। এজন্য আমি ও আমরা সকলে ব্যক্তিগতভাবে অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী।” 

যদিও পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান কর্তৃক পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা হওয়ার পরই শিক্ষার্থীরা হল ছাড়েন বলে প্রধান প্রত্যাবেক্ষক প্রভাষক তাহিয়া আনান ধীরার বক্তব্য থেকে জানা যায়। একাধিক শিক্ষার্থীও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের কেউ এ পত্রে স্বাক্ষর না করলে তাকে ৪০৯ নং কোর্সের পুনঃ পরীক্ষায় বসতে দেয়া হবে না মর্মে শ্রেণিকক্ষে এসে শাসিয়ে যান অধ্যাপক মোকাদ্দেম। 

প্রায় একই কথা উল্লেখ করে ১১ সেপ্টেম্বর বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভাপতি বরাবর একটি নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) পাঠান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশদ ফরিদী । নোট অব ডিসেন্টে রুশদ ফরিদী বলেন, "৪০৯ নং কোর্সের স্থগিত পরীক্ষা আবার নেয়ার জন্য ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে মিথ্যা বলানোর প্রক্রিয়াটি খুবই অন্যায় হয়েছে।”

"এটা একেবারেই সত্য নয় যে ছাত্র ছাত্রীরা স্বইচ্ছায় পরীক্ষার হল ত্যাগ করেছে। পরীক্ষার কমিটির চেয়ারম্যানের সাথে পরামর্শ করে পরীক্ষার দায়িত্বরত শিক্ষক এসে যখন তাঁদের বলেছে হল ত্যাগ করতে তখনই শুধু মাত্র হল ত্যাগ করে। এর আগে নয়,” রুশদ ফরিদী যোগ করেন। 

বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুল মোকাদ্দেম (এম এম আকাশ) শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে বিশ্রামে থাকায় তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা সম্ভব হয়নি।

বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, অধ্যাপক খন্দকার তাদেরকে পরিবেশগত অর্থনীতির তাত্ত্বিক দিকগুলোর থেকে ব্যবহারিক দিকগুলো বেশি পড়িয়েছেন। তিনি নিয়মমাফিক মিড টার্ম, ইনকোর্সের রেজাল্ট দিয়ে তার কোর্স শেষ করেন এবং তার পড়ানোর কৌশল শিক্ষার্থীদের কাছে উপভোগ্য ছিলো বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী জানায়। 

৪০৯ নং কোর্সের পরীক্ষা কবে নেওয়া হবে জানতে চেয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরীকে কল দিলে রিসিভ করেননি ও খুদেবার্তা পাঠালেও তার পক্ষ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি ।

মন্তব্য করুন: