সিলেটে হিন্দু শিক্ষকের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে ভুয়া দাবি প্রচার
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বাসিন্দা বীরেন্দ্র কুমার দেব (ঝুনু মাস্টার) নামের এক হিন্দু ধর্মবলম্বী শিক্ষকের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে দাবিতে সম্প্রতি একটি ভিডিও ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। দাবিটি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা ও বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্যও তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন। একই দাবি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়েছে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের প্রয়াত শিক্ষক বীরেন্দ্র কুমার দেব (ঝুনু মাস্টার)-এর বাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য এবং ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ঘটনায় হামলা বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই দাবির বিষয়ে অনুসন্ধানে গত ১৫ জানুয়ারি ‘Babla Malakar’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। ওই পোস্টে সংযুক্ত আটটি ভিডিওর মধ্যে প্রথম ভিডিওটির সঙ্গে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। মূলত, এটি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিরই দীর্ঘ সংস্করণ। পোস্টের বর্ণনা অনুযায়ী, ভিডিওটি বহরগ্রামে ‘ঝুনু মাস্টার’ নামের এক শিক্ষকের বাড়িতে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য, যা সেদিন দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে ঘটে।
একই দিন ‘Zia Uddin Chowdhury’ নামের আরেকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে করা একটি পোস্টে বলা হয়, বহর গ্রামের শিক্ষক বিকাশ স্যারের বাড়িতে (ঝুনু মাস্টার দাদার বাড়ি) বিকাল তিনটার দিকে আকস্মিকভাবে আগুন লাগে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়ি ও আসবাবপত্র পুড়ে যায়।
তবে, এসব প্রাথমিক পোস্টের কোথাও ঘটনাটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর ঘটনা হিসেবে দাবি করা হয়নি।
এছাড়া, গোয়াইনঘাট প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি পরিচয় দেওয়া সৈয়দ হেলাল আহমেদ বাদশা নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ১৫ জানুয়ারির ঘটনাটি নিয়ে এক ব্যক্তির বক্তব্য সংবলিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওতে বক্তব্যরত ব্যক্তি জানান, নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের বহর গ্রামের প্রয়াত শিক্ষক বীরেন্দ্র কুমার দেব (ঝুনু স্যার)-এর বাড়িতে দুপুর আড়াইটার দিকে আকস্মিকভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়। সে সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে শোবার ঘর ও রান্নাঘরসহ মোট আটটি কক্ষ ভস্মীভূত হয়। এতে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও গুরুত্বপূর্ণ সনদপত্রসহ আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুরো বক্তব্যে ঘটনাটিকে একটি দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে এবং কোথাও কোনো হামলার অভিযোগ তোলা হয়নি।
বক্তব্য থেকে আরও জানা যায়, উক্ত শিক্ষকের সন্তানদের একজন বিকাশ দেব, যিনি পিয়াইনগুল কলিম উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক।
এছাড়াও, গোয়াইনঘাট প্রেসক্লাবের সভাপতি পরিচয় দেওয়া এম এ মতিন নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে গত ১৬ জানুয়ারি প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মালিক বিকাশ কুমার দেবের বক্তব্য পাওয়া যায়। তিনি জানান, আগুনে তার বাড়ির সবকিছু পুড়ে গেছে এবং কোনো মালামাল অবশিষ্ট নেই। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কারও প্রতি তার কোনো সন্দেহ বা অভিযোগ নেই বলেও তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। তার ধারণা অনুযায়ী, বিদ্যুতের তারে ত্রুটি বা শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
পাশাপাশি, ১৬ জানুয়ারি প্রকাশিত সিলেটের স্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক একাত্তরের কথা-এর প্রতিবেদনেও একই তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বিকাশ চন্দ্র দেবের বক্তব্যের সঙ্গে উপরে বর্ণিত তথ্যের মিল রয়েছে। সেখানে কোম্পানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের বরাতে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি, সালুটিকর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, আগুনের উৎপত্তি খড়ের ঘর থেকেই হয়েছে।
সুতরাং, সিলেটের শিক্ষক বীরেন্দ্র কুমার দেবের বাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: