হাম কি এবং কেন এটি বিপজ্জনক?
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ৫ বছরের নিচে শিশুরা হাম রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। হাম শুধু সাধারণ র্যাশ বা ফুসকুড়ি নয়; এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফেলাইটিস) সহ মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।
হাম কীভাবে ছড়ায়?
হাম ভাইরাস শ্বাসনালী অথবা কনজাংটিভা (চোখের পর্দা) দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। এটি প্রধানত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে (কাশি বা হাঁচি) ছড়ায় এবং বড় আকারের ড্রপলেট বা বাতাসে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র অ্যারোসল কণার মাধ্যমে এর সংক্রমণ হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি র্যাশের আগে ৩ দিন থেকে ৪–৬ দিন পর্যন্ত সংক্রামক থাকে।
হামের সংস্পর্শে আসা ১০০ জন সংবেদনশীল ব্যক্তির মধ্যে প্রায় ৯০ জন আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি কক্ষ ত্যাগ করার পরেও ভাইরাসটি প্রায় ২ ঘণ্টা বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। তাই বিমান, চিকিৎসকের চেম্বার বা হাসপাতালেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হাম এর লক্ষণসমূহ:
হাম একটি গুরুতর সংক্রমণ, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ ওঠা এবং চামড়ায় দৃশ্যমান র্যাশ। ৮–১২ দিনের সুপ্তিকাল পর এটি মৃদু জ্বর দিয়ে শুরু হয়। এরপর চোখ ওঠা, আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা (ফোটোফোবিয়া), সর্দি এবং তীব্র কাশি শুরু হয়।
কোপলিক স্পট (ছোট সাদা বা নীল দাগ) সাধারণত ৫০–৭০% রোগীর গালের ভেতরের অংশে, প্রাক-মোলার দাঁতের কাছে প্রথম দেখা যায়। র্যাশ সাধারণত কপাল, কানের পেছনে এবং ঘাড়ের উপরের অংশে লালচে দানার মতো শুরু হয়। পরে তা ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
র্যাশ ওঠার প্রথম দিন পর্যন্ত উপসর্গগুলো আরও তীব্র হতে থাকে। র্যাশ সাধারণত কপাল (চুলের রেখা বরাবর), কানের পেছনে এবং ঘাড়ের উপরের অংশে লালচে দানার মতো শুরু হয়। এরপর এটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে বুক, পিঠ এবং হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ৫০% ক্ষেত্রে হাতের তালু ও পায়ের তলায় পৌঁছায়।
মুখ এবং শরীরের উপরের অংশের র্যাশগুলো একত্রে মিশে যেতে পারে। র্যাশ শুরু হওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য উপসর্গগুলো কমতে থাকে। যেভাবে র্যাশ ছড়িয়েছিল, ঠিক সেই ক্রমেই প্রায় ৭ দিন পর এগুলো মিলিয়ে যায় এবং চামড়ায় হালকা খোসা উঠতে পারে।
সব লক্ষণের মধ্যে কাশি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে লসিকাগ্রন্থি ফুলে যেতে পারে।
রোগনির্ণয় ও রোগ নিশ্চিতকরণ পদ্ধতি:
হামের রোগনির্ণয় সাধারণত ক্লিনিক্যাল লক্ষণ এবং রোগীর ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করেই করা হয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় শ্বেত রক্তকণিকা, বিশেষ করে লিম্ফোসাইটের সংখ্যা কম পাওয়া যায়।
কালচার ও পি.সি.আর.:
রক্ত, প্রস্রাব বা শ্বাসনালীর নিঃসরণ থেকে ভাইরাস কালচার করা যায়। এছাড়া পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (PCR)-এর মাধ্যমে নাসিকাগহ্বর বা গলা থেকে নেওয়া নমুনায় ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব।
সেরোলজি:
রক্তে IgM অ্যান্টিবডি পরীক্ষা সবচেয়ে সুবিধাজনক পদ্ধতি। র্যাশ ওঠার ১–২ দিন পর এটি রক্তে ধরা পড়ে এবং প্রায় ১ মাস পর্যন্ত থাকে। যদি র্যাশ ওঠার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষা করে নেগেটিভ আসে, তবে পুনরায় পরীক্ষা করা উচিত। ২–৪ সপ্তাহের ব্যবধানে দুইবার নমুনা সংগ্রহ করে IgG অ্যান্টিবডির চারগুণ বৃদ্ধি দেখেও রোগ নিশ্চিত করা যায়।
হামের প্রধান জটিলতাসমূহ:
১. নিউমোনিয়া: এটি হামে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
২. শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা: শিশুদের ক্ষেত্রে ক্রুপ, ট্রাকাইটিস এবং ব্রঙ্কিওলাইটিস দেখা যায়।
৩. ভিটামিন-এ অভাব: এতে শিশু অন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
৪. পাকস্থলী ও অন্ত্রের সমস্যা: তীব্র ডায়রিয়া ও বমির কারণে পানিশূন্যতা দেখা দেয়।
৫. কানের সংক্রমণ: এটি হামের সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা।
৬. স্নায়বিক জটিলতা: প্রতি ১,০০০ জনে ১–৩ জন এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে।
৭. অন্যান্য: গর্ভাবস্থায় গর্ভপাত বা মৃত সন্তান জন্মের ঝুঁকি থাকে।
কাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি?
• ৫ বছরের কম বয়সী শিশু
• অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
• যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম
• গর্ভবতী নারী
হামের চিকিৎসা পদ্ধতি:
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই; তাই চিকিৎসা উপসর্গভিত্তিক।
১. পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার
২. জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল
৩. শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন
৪. ভিটামিন-এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
৫. জটিল সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক
৬. গুরুতর হলে হাসপাতালে ভর্তি
হামের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও টিকাদান:
হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। বাংলাদেশে সাধারণত হাম-রুবেলা (MR) ও হাম-মাম্পস-রুবেলা (MMR) টিকা দেওয়া হয়।
প্রথম ডোজ: ৯ মাসে
দ্বিতীয় ডোজ: ১৫ মাসে
বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি:
২০২৫–২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির কারণ:
মূল কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন। কোভিড-১৯-এর সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকা পায়নি।
উত্তরণের উপায়:
• সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা
• সচেতনতা বৃদ্ধি
• স্বাস্থ্যবিধি মানা
• ভিটামিন-এ নিশ্চিত করা
লেখক: ডাঃ মোঃ আবু তালহা
এমবিবিএস, এফসিপিএস (শিশুরোগ)
সহকারী অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ক্রিটিক্যাল কেয়ার, এন.এইচ.এফ.এইচ এন্ড আর.আই. ঢাকা
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: