আকাশে লেজার ছুড়ে ‘কৃত্রিম তারা’ বানাচ্ছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, কেন?
চিলির আতাকামা মরুভূমির আকাশে রাতের আঁধার ভেদ করে ছুটছে একের পর এক শক্তিশালী লেজার রশ্মি। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কল্পবিজ্ঞানের কোনো সিনেমার দৃশ্য। কিন্তু এই লেজারের লক্ষ্য কোনো রহস্যময় অভিযান নয়। মহাবিশ্বের আরও স্পষ্ট ছবি পেতেই আকাশে লেজার ছুড়ে ‘কৃত্রিম তারা’ তৈরি করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
চিলির প্যারানাল অবজারভেটরিতে ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ইএসও)-র পরিচালিত ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (ভিএলটি) এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। লেজারের সাহায্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯০ কিলোমিটার ওপরে থাকা সোডিয়াম পরমাণুকে আলো ছড়াতে উদ্দীপ্ত করা হয়। সেখানেই তৈরি হয় কৃত্রিম আলোকবিন্দু, যা টেলিস্কোপের জন্য একটি ‘লেজার গাইড স্টার’ হিসেবে কাজ করে।

মহাকাশ পর্যবেক্ষণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বড় একটি বাধা। দূরের নক্ষত্র, গ্যালাক্সি কিংবা অন্য মহাজাগতিক বস্তু থেকে আসা আলো বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছানোর সময় বিকৃত হয়ে যায়। এর ফলে স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপে মহাজাগতিক বস্তুর ছবি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
এই সমস্যা কাটাতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন ‘অ্যাডাপটিভ অপটিকস’ প্রযুক্তি। সহজভাবে বললে, এই ব্যবস্থায় টেলিস্কোপের একটি বিশেষ আয়না অত্যন্ত দ্রুত নিজের আকৃতি সামান্য পরিবর্তন করে বায়ুমণ্ডলের কারণে তৈরি হওয়া আলোর বিকৃতি সংশোধন করে। তবে আয়নাটিকে ঠিক কতটা পরিবর্তন করতে হবে, তা বুঝতে একটি উজ্জ্বল রেফারেন্স পয়েন্ট প্রয়োজন। আকাশে কাছাকাছি যথেষ্ট উজ্জ্বল কোনো প্রাকৃতিক তারা থাকলে সেটি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সব সময় এমন তারা পাওয়া যায় না। তখনই কাজে আসে লেজার।

আকাশের দিকে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠানো হলে তা বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯০ কিলোমিটার ওপরে থাকা সোডিয়াম পরমাণুর স্তরে পৌঁছায়। নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লেজার আলো সোডিয়াম পরমাণুকে উদ্দীপ্ত করে। ফলে পরমাণুগুলো আলো ছড়াতে শুরু করে এবং টেলিস্কোপের দৃষ্টিতে একটি উজ্জ্বল আলোকবিন্দু তৈরি হয়।
এই আলোকবিন্দুই ‘লেজার গাইড স্টার’ বা কৃত্রিম তারা। এটি কোনো বাস্তব নক্ষত্র নয়; বরং টেলিস্কোপের জন্য প্রয়োজনীয় একটি কৃত্রিম রেফারেন্স। এরপর টেলিস্কোপ ওই কৃত্রিম তারার আলো বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আলোকে কতটা বিকৃত করছে। সেই তথ্য অনুযায়ী অ্যাডাপটিভ অপটিকসের বিশেষ আয়না অত্যন্ত দ্রুত নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে। এতে বায়ুমণ্ডলের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে মহাকাশের বস্তু আরও তীক্ষ্ণভাবে দেখা সম্ভব হয়।
ভিএলটি-এর ইউনিট টেলিস্কোপ ৪ বা ‘ইয়েপুন’-এ চারটি লেজার গাইড স্টার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি লেজারের ক্ষমতা ২২ ওয়াট এবং প্রতিটি রশ্মির ব্যাস প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার। ইএসও-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি লেজার সাধারণ লেজার পয়েন্টারের অনুমোদিত সর্বোচ্চ ক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৪ হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।

একসঙ্গে একাধিক কৃত্রিম তারা তৈরি করার ফলে টেলিস্কোপ আকাশের তুলনামূলক বড় একটি এলাকায় বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিরতা পরিমাপ ও সংশোধন করতে পারে। ফলে স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ আরও সূক্ষ্ম হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ভিএলটি-এর চারটি ৮ মিটার শ্রেণির টেলিস্কোপে একটি করে লেজার যুক্ত করে গ্র্যাভিটি+ প্রকল্পের বড় একটি ধাপ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় চারটি টেলিস্কোপের আলো একসঙ্গে ব্যবহার করে আরও বিস্তৃত আকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আকাশে এত শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠানো হলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এ কারণে ভিএলটি-এর লেজার ব্যবস্থায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আকাশ পর্যবেক্ষণকারী ক্যামেরা বিমানের গতিবিধি শনাক্ত করতে পারে। কোনো বিমান লেজার রশ্মির কাছাকাছি চলে এলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেজার বন্ধ করে দেয়।
আকাশে দেখা ওই বিশাল লেজার রশ্মি আসলে মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকা টেলিস্কোপের জন্য এক ধরনের ‘কৃত্রিম চোখ’। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যখন দূরের মহাজাগতিক বস্তুর আলোকে ঝাপসা করে দেয়, তখন কৃত্রিম এই তারার সাহায্যে সেই বিকৃতি মেপে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন করা হয়।
ফলে দূরের নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ব্ল্যাক হোলের আশপাশের অঞ্চল কিংবা গ্রহ-গঠনকারী ডিস্কের মতো মহাজাগতিক বস্তুর আরও সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ, আকাশে ছোড়া এই লেজার কোনো রহস্যময় অস্ত্র নয়; বরং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাধা পেরিয়ে মহাবিশ্বকে আরও পরিষ্কারভাবে দেখার অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি।
সূত্র: বিবিসি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: