এআইয়ের কারণে বড় ঝুঁকিতে শ্রমবাজার, সতর্ক করলেন আইএমএফ প্রধান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজার, শিক্ষাব্যবস্থা ও কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এতে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে এ ঝুঁকি আরও বেশি। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের প্রথম দিনে তিনি এসব কথা বলেন। খবর রয়টার্সের।
জর্জিয়েভা বলেন, এআইয়ের প্রভাব ক্রমেই এমন এক ‘সুনামি’তে রূপ নিচ্ছে, যা শ্রমবাজার, করব্যবস্থা ও শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। একদিকে এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখতে সহায়তা করছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আইএমএফের গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে, কম দক্ষতানির্ভর হয়ে পড়তে পারে কিংবা পুরোপুরি বিলুপ্ত হতে পারে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে এ হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
জর্জিয়েভার মতে, এআই খাতে বিনিয়োগের উত্থান এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর ফলে এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনা শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহে সংকট বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে নিচের দিকে টানছে। তবে এআই খাতে বিনিয়োগ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করছে, যা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। জর্জিয়েভা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ১০ শতাংশ চাকরিতে ইতোমধ্যে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার প্রয়োজন হচ্ছে। নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সুযোগ কমার বিপরীতে নির্মাণ খাত এবং ডেটা সেন্টারের মতো খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে।
এআইয়ের প্রসার অর্থনীতিতে শ্রমের তুলনায় মূলধনের ভূমিকা বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন আইএমএফ প্রধান। এতে সরকারগুলোর কর আদায়ের পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
প্রযুক্তিটির প্রভাব তুলে ধরে জর্জিয়েভা বলেন, এআই মানুষের কাজ করার পদ্ধতি থেকে শুরু করে জীবনযাপনের ধরন পর্যন্ত বদলে দিচ্ছে। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে এআই সহকারী তাকে দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে ৩০ সেকেন্ডের একটি বার্তা দেয়।
এআই প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এআই অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার সরবরাহকারী অনেক প্রতিষ্ঠান এশিয়ায় অবস্থিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এআইয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়া তরুণদের চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম।
তিনি বলেন, কর্মজীবনের শুরুতে স্নাতকদের প্রথম চাকরি পাওয়ার সুযোগ এখন কম চাহিদার মুখে পড়ছে। সরকারগুলোকে দ্রুত এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে হবে।
থারমান আরও বলেন, এআইয়ের প্রভাবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নতুন বৈষম্য তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলে বৈষম্য আরও বাড়বে। তাই এআই ব্যবহার করে ভালো চাকরি সৃষ্টি এবং মানুষের দক্ষতার উপযোগী কাজের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা মনে করেন, এআইয়ের কারণে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিগুলো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এআইয়ের কারণে বড় ধরনের পরিবর্তন মূলত সেই উন্নত অর্থনীতিগুলোতে ঘটতে পারে, যেসব দেশ বড় এআই মডেল তৈরি করছে। উদীয়মান বাজারগুলো এখনো বড় ভাষাভিত্তিক মডেল তৈরির পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এ সপ্তাহের বৈঠকে সংস্থা দুটির ১৯১টি সদস্যদেশের অর্থনৈতিক কর্মকর্তাসহ প্রায় ১৮ হাজার মানুষের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ, এআইয়ের প্রভাব এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: