আপনার ওপর জাদু করা হয়েছে কি না, ইসলামের আলোকে যেভাবে বুঝবেন
ছবি: সংগৃহীত
মানুষের জীবনে কখনো কখনো নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক অস্থিরতা কিংবা বিভিন্ন কাজে বাধার মুখে পড়ে কেউ কেউ মনে করেন, তাদের ওপর হয়তো কালো জাদু করা হয়েছে। ইসলামে জাদুর অস্তিত্বের কথা উল্লেখ থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ দেখেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, কারও ওপর জাদু করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা জানা এবং কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা জরুরি।
ইসলামে জাদু সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
পবিত্র কোরআনে জাদুর বিষয়টি একাধিক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে জাদুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, জাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর বিষয়টিও মানুষ শিখত। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর মাধ্যমে কারও ক্ষতি করতে পারত না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এর মাধ্যমে কারও ক্ষতি করতে পারে না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১০২)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, জাদু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা জরুরি।
যেসব বিষয়কে অনেকে জাদুর লক্ষণ মনে করেন
কিছু মানুষ অস্বাভাবিক ভয়, দুঃস্বপ্ন, পারিবারিক কলহ, ইবাদতে অমনোযোগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতাকে জাদুর প্রভাব বলে মনে করেন। কিন্তু ইসলামের নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে এসবের কোনো একটিকে জাদুগ্রস্ত হওয়ার নিশ্চিত লক্ষণ বলা যায় না।
এসব সমস্যার পেছনে শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক জটিলতা কিংবা অন্যান্য স্বাভাবিক কারণও থাকতে পারে। তাই শুধু এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিজের বা অন্য কারও ওপর জাদু করা হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
জাদু থেকে সুরক্ষায় কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা
ইসলামে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমল করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি আমল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিলাওয়াত: রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে ঘুমানোর আগে দুই হাত একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন এবং সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়তেন। এরপর শরীরের যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন। তিনি এভাবে তিনবার করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)
২. আয়াতুল কুরসি পাঠ: সুরা আল-বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত অর্থাৎ আয়াতুল কুরসি পাঠের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। সহিহ বুখারির ২৩১১ নম্বর হাদিসে রাতে এটি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক থাকার এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান কাছে না আসার কথা বর্ণিত হয়েছে।
৩. সুরা আল-বাকারার তিলাওয়াত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না। যে ঘরে সুরা আল-বাকারা পাঠ করা হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮০)
৪. নিয়মিত দোয়া ও জিকির: সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির, নামাজ এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে একজন মুসলমান নিজের ঈমান ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা দৃঢ় করতে পারেন।
জাদুর সন্দেহ হলে কী করবেন?
কারও মনে জাদু করা হয়েছে বলে সন্দেহ তৈরি হলে প্রথমেই আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে এবং কোরআন-সুন্নাহসম্মত আমল করতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত ও জ্ঞানসম্পন্ন আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
ইসলামে রুকইয়াহ শারইয়াহ বা কোরআন ও সহিহ দোয়ার মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করার অনুমতি রয়েছে। তবে এতে শিরক, অজানা মন্ত্র কিংবা ইসলামবিরোধী কোনো কাজ থাকা যাবে না।
কেউ জাদু কাটানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে, ভয় দেখালে, অজানা বস্তু ব্যবহার করতে বললে কিংবা চিকিৎসা বন্ধ করতে পরামর্শ দিলে সতর্ক থাকতে হবে। শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।
ইসলামে জাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করা হলেও সব বিপদ-আপদ, অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক সমস্যাকে জাদুর ফল মনে করা সঠিক নয়। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ দেখে জাদু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। একজন মুসলমানের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে চলা এবং সন্দেহের বশে কাউকে অভিযুক্ত না করা।
বিভি/এনএইচ













মন্তব্য করুন: