• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬

বিশ্ব কূটনীতিতে ট্রাম্পের একক রাজত্ব, কোণঠাসা হওয়ার ঝুঁকিতে জাতিসংঘ

প্রকাশিত: ১৫:১৪, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘বোর্ড অব পিস’ চালু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা জাতিসংঘের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে পাশ কাটাতেই এই নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। একপাশে কয়েক দশকের পুরোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ, অন্যপাশে ট্রাম্পের ‘অ্যাকশন-অরিয়েন্টেড’ ব্যক্তিগত কূটনীতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরানোর পথে ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ উদ্যোগের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের ভাষায়, এই বোর্ড ‘দশকের পর দশক ধরে চলা রক্তপাত বন্ধ করে একটি স্থায়ী ও সুন্দর শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে’। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই বলে আসছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ থামাবেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে এই বোর্ড।

তবে আন্তর্জাতিক মহলে এই বোর্ড নিয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ। বোর্ডের খসড়া সনদ অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প আজীবনের জন্য এর চেয়ারম্যান থাকবেন। বোর্ডের সদস্য আহ্বান, নতুন সংস্থা গঠন বা বাতিল এবং নিজের উত্তরসূরি মনোনয়নের ক্ষমতাও থাকবে তার হাতে। নতুন কোনো দেশ স্থায়ী সদস্য হতে চাইলে দিতে হবে ১০০ কোটি ডলার। ফলে বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে জাতিসংঘের বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা। 

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে চ্যাথাম হাউসের  সিনিয়র কনসাল্টিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বোর্ডের বৈধতা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন,'' ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি বোর্ড মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মতো, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক ইউরোপীয় দেশই এখানে অনুপস্থিত। আবার ভ্লাদিমির পুতিনের মতো ব্যক্তিদের এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আপনি যদি একটি ‘শান্তি বোর্ড’ চান, তবে এমন ব্যক্তিদের সেখানে রাখতে পারেন না যারা নিজেই অভিযুক্ত। একইভাবে এই তালিকায় নেতানিয়াহুও রয়েছেন, যার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। ট্রাম্পের মনে জাতিসংঘ বা বৈশ্বিক নিয়ম-নীতির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপে বর্তমান নিয়মগুলোকে উপেক্ষা করে নিজের নির্দেশিত একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে চান। তার এই বোর্ড-এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এটি জি-৭ বা জি-২০ জোটের মতো। এর সদস্যদের যতটুকু ক্ষমতা আছে, এই বোর্ডের ক্ষমতা ঠিক ততটুকুই। এটি আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। জাতিসংঘের মতো এর কোনো শক্তিশালী সনদ বা চার্টার নেই। এটি কেবল একটি উদ্ভাবন, যা কোনো আলোচনা ছাড়াই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছায় তৈরি হয়েছে।'' 

‘বোর্ড অব পিস’ ধারণাটি মূলত দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হিসেবে সামনে এসেছে। ট্রাম্প এই বোর্ডে কোনো পেশাদার আমলা বা দীর্ঘদিনের কূটনীতিবিদদের চেয়ে তার প্রতি অনুগত দক্ষ ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেই এর প্রধান নিয়ন্ত্রক এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগীরা এটি পরিচালনা করছেন। 

অন্যদিকে ১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘ বহু আগেই শান্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের বাজেটের একক বৃহত্তম দাতা। ফলে ট্রাম্প যদি বাজেট কমিয়ে এই অর্থ ‘বোর্ড অব পিস’-এ ব্যয় করেন, তবে জাতিসংঘ কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়বে। 

জাতিসংঘের একটি বিশাল আইনি ও মানবাধিকার কাঠামো রয়েছে, যা সারা বিশ্বে বিস্তৃত। ট্রাম্পের বোর্ড হয়তো যুদ্ধ থামাতে পারবে, কিন্তু বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, খাদ্য সহায়তা বা জলবায়ুর মতো বিষয়গুলো সামলানোর ক্ষমতা তাদের থাকবে না। এছাড়া চীন বা ইইউ-এর মতো শক্তিগুলো চাইবে না বিশ্ব রাজনীতি পুরোপুরি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রিত কোনো বোর্ডের হাতে চলে যাক। ফলে এটি জাতিসংঘকে সরাসরি ধ্বংস না করলেও 'ওয়াশিংটন-কেন্দ্রিক নতুন বিশ্বব্যবস্থা' তৈরির পথ প্রশস্ত করবে।  

বিভি/এমএফআর

মন্তব্য করুন: