• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬

ইরানে পরিবর্তন অনিবার্য— নতুন বিপ্লবের দোরগোড়ায় তেহরান?

প্রকাশিত: ১৬:৫৮, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ইরানে পরিবর্তন অনিবার্য— নতুন বিপ্লবের দোরগোড়ায় তেহরান?

বিক্ষোভ থেমে গেছে। ইরান আপাতত নীরব। রাস্তায় আগুন নেই, থেমেছে স্লোগান। কিন্তু এই নীরবতা স্বস্তির নয়। যেন ঝড়ের আগ মুহূর্তের অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা। ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র শক্ত হাতে বিক্ষোভ সামাল দিয়েছে বটে, কিন্তু যে ক্ষোভ থেকে এর বিস্ফোরণ, সেই ক্ষোভের কারণগুলোর সমাধান হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের সামনে এখন খোলা আছে মাত্র দুইটি দরজা, হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যাপক আপস করে নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচা ও অর্থনীতি সংস্কার করা, না হয় আরও বড় গণ–অভ্যুত্থানের মুখে পড়া।

অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক অনাস্থা আর নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ইরান এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, বর্তমান অবস্থান কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। খামেনির রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনও ভেঙে পড়েনি ঠিকই, কিন্তু পরিবর্তন না আনলে এখান থেকে পরিস্থিতি কেবল নিচের দিকেই যাওয়ার আশঙ্কা। 

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বোঝায় ইরানি মুদ্রার মান এখন তলানিতে। অন্যদিকে তেল রপ্তানিও কমেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতির হার ৪২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যাপক সংকট। এসব চাপই ডিসেম্বরের শেষে বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে শাসনব্যবস্থা বদলের প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে—যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয় ইরানে।
 

এখন প্রশ্ন, এই রুদ্ধদশা থেকে কীভাবে বের হবে ইরান? কঠোর নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে চাইলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতেই হবে। তা না করলে বেহাল অর্থনৈতিক দশার জেরে জনগণের মাঝে জমতে থাকা ক্ষোভ আরো বড় আকারে বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসা মানেই, পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আর আঞ্চলিক মিত্রদের যে নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, তাতে ছাড় দিতে হবে খামেনিকে। কিন্তু এসব গড়ে উঠেছে বহু বছরের সাধনায়, যা ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর মেরুদণ্ড। অতীতে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও ক্ষেপণাস্ত্র বা আঞ্চলিক সশস্ত্র মিত্রদের প্রশ্নে ইরান কখনোই আপস করেনি।

কিন্তু সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতি ইরানের আঞ্চলিক শক্তিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর মাঝে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে ইরান। এতকাল ইরানের নাগরিকেরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিনিময়ে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়ে এলেও, গত বছরের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে যখন ছয় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারালে, সেই নিশ্চয়িতবোধের স্তম্ভটিও নড়বড়ে হয়ে গেছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলীরেজা আজিজি বলছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থায় এরই মাঝে একধরনের রূপান্তর শুরু হয়েছে। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছে। ধর্মতাত্ত্বিক নেতৃত্বের প্রভাব ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে ক্ষমতা। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখন শুধু সামরিক শক্তি নয়, অর্থনীতি ও রাজনীতির অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়। 

আল জাজিরাকে আজিজি বলেন, খামেনি পরবর্তী সময়ে আমরা বর্তমান কাঠামোর ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আর দেখতে পাব না। সেক্ষেত্রে জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হবে, নাকি সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো নিরাপত্তা বাহিনীর হাত ধরে নতুন কোনো রূপ লাভ করবে—সেটিই দেখার বিষয়। তবে পরিবর্তন অনিবার্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আপস বা অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণ, এ দুইয়ের কিছু একটার দিকে যাচ্ছে ইরান। বদলানো ছাড়া আর পথ খোলা নেই তাদের সামনে। আলোচনার টেবিল থেকে, নাকি সংঘাত-সহিংসতা থেকে সেই বদল আসবে, সেটাই এখন প্রশ্ন। 

বিভি/এইচজে

মন্তব্য করুন: