• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইউরোপকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ০১:৩৬, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ইউরোপকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

ইউরোপকে নিজেদের জনগণ, মূল্যবোধ ও জীবনধারা রক্ষায় প্রয়োজনে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে—এ কথা বলেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

স্টারমার যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সহযোগিতার আহ্বান জানান, যার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ও রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে ইউরোপকে “নিজের পায়ে দাঁড়াতে” হবে।

বক্তৃতায় স্টারমার জানান, রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য তাদের ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ আর্কটিক ও ‘হাই নর্থ’ অঞ্চলে মোতায়েন করবে। ‘হাই নর্থ’ বলতে পৃথিবীর সর্বউত্তর অঞ্চলকে বোঝায়, যার মধ্যে আর্কটিক সার্কেল ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাও অন্তর্ভুক্ত।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অন্যান্য ন্যাটো মিত্ররাও এ উদ্যোগে যুক্ত হবে, যাতে ওই অঞ্চলে রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করা যায়।

ইউক্রেন নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো শান্তিচুক্তি হলেও রাশিয়ার পুনরায় সামরিক শক্তি বৃদ্ধি “আরও ত্বরান্বিত” হতে পারে বলে সতর্ক করেন স্টারমার। তাই ইউরোপকে আগ্রাসন প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে লড়াইয়ের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বলেন, “আমাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, কারণ এটাই এই সময়ের প্রধান শক্তি।”

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছিলেন—প্রয়োজনে ইউরোপীয় অংশীদাররা ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মিত্রদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে কি না। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাটোর মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউরোপে বিস্তার রোধ করা। বর্তমানে ৩২ সদস্যবিশিষ্ট এ জোটের অন্যতম মূলনীতি হলো অনুচ্ছেদ ৫, যেখানে বলা হয়েছে—এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

স্টারমার ট্রাম্পের সংশয় দূর করতে বলেন, অনুচ্ছেদ ৫–এর প্রতি যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকার “আগের মতোই অটুট”। তিনি আরও বলেন, “কোনো সন্দেহ রাখবেন না—ডাকা হলে যুক্তরাজ্য আজই আপনাদের পাশে দাঁড়াবে।”

স্টারমারের আগে বক্তব্য দেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন। তিনি স্টারমারকে “অটল মিত্র ও বন্ধু” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য উভয়ই এমন বাহ্যিক শক্তির মুখোমুখি, যারা ভেতর থেকে তাদের ঐক্য দুর্বল করতে চায়। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থানের কারণে ইউরোপ যেন এক ধরনের “ধাক্কা থেরাপি” পেয়েছে, ফলে এখন প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি নিজেকেই নিতে হবে।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “এখনই সময় রাশিয়ার যুদ্ধের খরচ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাড়িয়ে দেওয়ার।”

ডাউনিং স্ট্রিট জানায়, শনিবার মিউনিখে স্টারমার ও ফন ডার লায়েনের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। সেখানে তারা একমত হয়েছেন যে ইউরোপকে আরও শক্তিশালী হয়ে “আরও ইউরোপকেন্দ্রিক ন্যাটো” গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে।

ব্রেক্সিটের পর থেকে স্টারমারের লেবার সরকার ব্রাসেলসের সঙ্গে সম্পর্ক “পুনর্গঠন” করার চেষ্টা করলেও একক বাজারে (সিঙ্গেল মার্কেট) না ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে এবার নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে স্টারমার বলেন, বর্তমান ইইউ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক “উপযুক্ত নয়” এবং ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু সমঝোতা বা ছাড় দিতে হতে পারে।

তিনি বলেন, “আমাদের দেখতে হবে, কোন কোন খাতে আমরা একক বাজারের আরও কাছাকাছি যেতে পারি—যেখানে তা উভয় পক্ষের জন্যই উপকারী হবে। এর ফলে নিরাপত্তা বাড়বে, যুক্তরাজ্য ও ইইউ উভয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার হবে, যা প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে এবং ইউরোপীয় শিল্প পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে যুক্তরাজ্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে।”

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক উপায়ে ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের আহ্বান জানান এবং বলেন, “পুতিনকে থামাতে হবে।” ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপকে সম্মিলিতভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব মনে করেন, রাশিয়া বর্তমানে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫–এর দৃঢ়তা পরীক্ষা করবে না এবং তিনি ন্যাটোর প্রতি তাৎক্ষণিক কোনো সরাসরি হুমকি দেখছেন না।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনার বিশ্বের শীর্ষ ফোরাম হিসেবে পরিচিত বার্ষিক মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে স্টারমারের এ ভাষণ এমন এক সময় আসে, যখন তিনি নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।

দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে স্বীকার করায় লেবার পার্টির অনেক এমপি তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। স্কটিশ লেবার নেতা আনাস সারওয়ার পর্যন্ত তার পদত্যাগ দাবি করেন।

সোমবার ওয়েস্টমিনস্টারে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, স্টারমার হয়তো সেদিনই পদত্যাগ করবেন। তবে তার মন্ত্রিসভা তাকে সমর্থন জানায় এবং তিনি টিকে যান।

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তাকে দুর্বল করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্টারমার মিউনিখে উপস্থিত বিশ্বনেতাদের বলেন, “না, আমি তা মনে করি না। সপ্তাহের শুরুতে যতটা দুর্বল ছিলাম, শেষে তার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত অবস্থানে আছি। আর সেটি খুব ভালো অবস্থান।”

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন: