ব্যর্থ হলো মৃত্যুদণ্ড প্রক্রিয়া: জ্ঞান ফেরার পর ‘ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত’ সেই ক্রিস্টা পাইক
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরেছে দণ্ডিত খুনি ক্রিস্টা পাইকের। জ্ঞান ফেরার পর তিনি ‘ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত’ ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী র্যান্ডি স্পাইভি। বুধবার (৭ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে স্পাইভি জানান, জ্ঞান ফেরার পর পাইকের প্রথম কথাগুলোর মধ্যে ছিল—‘আমি কোথায়?’ এবং ‘আপনি কে?’
১৯৯৫ সালে কলিন স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ৫০ বছর বয়সী পাইককে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। তবে দুই দফা ইনজেকশন দেওয়ার পরও তিনি বেঁচে যান।
বিশেষজ্ঞ ও পাইকের আইনজীবীদের দাবি, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা থেকে কোনো মার্কিন বন্দির বেঁচে যাওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। পাইককে এখন পর্যন্ত এ ধরনের প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) আদালত টেনেসি কর্তৃপক্ষকে ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। পাইকের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তিনি এখনো গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের বিছানায় তার হাত ও পা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
আইনজীবী স্পাইভি জানান, কয়েক দিন ধরে তাদের ধারণা ছিল পাইক আর জ্ঞান ফিরে পাবেন না। যেকোনো সময় তাকে লাইফ সাপোর্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছিলেন তারা। তবে মঙ্গলবার সবার জন্য ‘বিস্ময়কর’ ঘটনা ঘটে। হঠাৎ করে কথা বলতে শুরু করেন পাইক। যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টার বিষয়ে তার স্মৃতি খুবই সীমিত।
স্পাইভি বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইক তার হাতে শিরা খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সহায়তা করেছিলেন। ইনজেকশন দেওয়ার সময়ও তিনি শান্ত ও ভদ্র ছিলেন। এরপর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তিনি নিজেকে এমন একটি অবস্থায় দেখতে পান, যেখানে তার গলায় একটি টিউব ছিল এবং আশপাশের মানুষদের তিনি চিনতে পারছিলেন না। স্পাইভির ভাষ্য, বর্তমানে পাইকের দুই হাতই ব্যাপকভাবে ফুলে গেছে।
তিনি আরও জানান, পাইকের এক হাতে রক্ত জমাট বেঁধেছে, নিউমোনিয়া হয়েছে এবং তিনি গিলতে পারছেন না। স্পাইভি বলেন, পুরো ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে এই অভিজ্ঞতার পর পাইক ‘ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত’ হয়ে পড়েছেন। দুই দফা পেন্টোবারবিটাল নামের ওষুধ প্রয়োগের পরও যখন স্পষ্ট হয় যে পাইকের মৃত্যু হয়নি, তখন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক দিন অচেতন থাকার পর চিকিৎসকেরা তার শরীর থেকে প্রয়োগ করা ওষুধের প্রভাব দূর করার চিকিৎসা দেন।
বুধবার জরুরি শুনানিতে পাইকের আইনজীবীরা ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রমাণ সংরক্ষণের আবেদন করেন। এসব প্রমাণ ভবিষ্যতে টেনেসি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মামলার ভিত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
পাইকের আইনজীবী লুক ইনেন বিচারক চ্যান্সেলর আই’শিয়া মাইলসকে জানান, তার মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত পাইক অচেতন ছিলেন এবং কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। এখন তিনি সীমিতভাবে কথা বলতে পারছেন।
টেনেসির সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল উইল আয়রস বিষয়টিকে ‘অস্বাভাবিক প্রক্রিয়াগত পরিস্থিতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাজ্য ইতোমধ্যে প্রমাণ সংরক্ষণে বাধ্য থাকায় জরুরি আবেদন করার প্রয়োজন ছিল না। তবে বিচারক মাইলস নির্দেশ দেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কক্ষে থাকা সবকিছু সংরক্ষণ করতে হবে। এর মধ্যে আইভি লাইন, সিরিঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম এবং প্যাকেজিং, নির্দেশিকা ও লেবেলসহ অন্যান্য সামগ্রীও রয়েছে।
এ ছাড়া ৩০ সেপ্টেম্বরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে, সময় এবং পরে পাইকের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দেন বিচারক। মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো তথ্য যেন ভুলবশত হারিয়ে বা মুছে না যায়, সে বিষয়ে রাজ্য কর্তৃপক্ষকে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শও দেন তিনি।
পাইককে আবার কবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে—বিচারকের এমন প্রশ্নের জবাবে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আয়রস বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময় রাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় কী ভুল হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি উত্তর চান। এ ঘটনায় রাজ্যের কারা বিভাগের প্রধানও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে পাইকের আইনজীবীরা তাকে ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আবেদন করেছেন, যাতে তিনি সরাসরি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তারা পাইকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগও চেয়েছেন। লুক ইনেন জানান, সম্প্রতি হাসপাতালে পাইকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাদের দুই ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের হাতকড়া খুলে দেওয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও টেনেসির কারা কর্মকর্তারা পাইককে হাসপাতালের বিছানার সঙ্গে শিকল দিয়ে রেখেছেন। হাসপাতাল থেকে তাকে কোনো রাজ্য পরিচালিত হাসপাতাল বা অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে আইনজীবীদের জানানো বাধ্যতামূলক করার আবেদনও করা হয়েছে।
১৯৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে পাইক তার তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের সঙ্গে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যা করেন। সমস্যাগ্রস্ত কিশোরদের জন্য আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে তাদের সঙ্গে স্লেমারের পরিচয় হয়েছিল। সেই সময় শিপের বয়স ছিল ১৭ বছর। আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ওই ঘটনায় তার জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য হয়নি। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: