দিল্লিতে ধরপাকড়, রাজ্যে রাজ্যে ক্ষোভ: মোদির বিরুদ্ধে ফুঁসছে গোটা ভারত?
ছবি: ডেইলি সাবাহ্
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে। আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন শিক্ষার্থী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মীরা। বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ একাধিক রাজনৈতিক নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। কয়েক ঘণ্টা পর তাদের অনেককে ছেড়ে দেওয়া হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধী নেতারা। এদিকে, আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
রাজধানী নয়াদিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভকারীদের দিল্লিতে প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে রাজধানীর ৪৫টি মেট্রো স্টেশন। তবে এত কড়াকড়ির মধ্যেও বিভিন্ন রাজ্য থেকে দিল্লির দিকে যাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অনেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারেরও পদত্যাগ দাবি করছেন।
বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বিরোধী নেতারা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তরুণদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলন দমনে যত পুলিশ মোতায়েন করা হোক কিংবা যত নেতাকর্মীকে আটক করা হোক, প্রতিবাদ থামানো যাবে না।
পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকও আটকদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের মুক্তি না দিলে অনশনে বসার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন আইনজীবীরাও। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তাদের অনেকে। অন্যদিকে, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষ থেকে আজ দিল্লির যন্তর-মন্তরের সামনে আবারও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে।
শনিবার দিনভর নয়াদিল্লির বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্ষোভকারীদের আটক করে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীদেরও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজের বাড়ির সামনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ধর্নায় বসলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটক করা হয়। পরে দিল্লির লোধি এস্টেট এলাকায় প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় আটক হন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
এ ছাড়া কেরালা হাউসের কাছাকাছি এলাকা থেকে কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং যন্তর-মন্তরে যাওয়ার পথে ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে আটক করা হয়।
শনিবার সকালে যন্তর-মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগেই নিজ বাড়ি থেকে আটক হন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ধ্রুব। পরে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমানের ভেতর থেকেই আটক করা হয় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপককে। আটকের সময় তিনি মোদি সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগ তোলেন।
এ সময় সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকেও আটক করা হয়। দলের শীর্ষ নেতারা আটক হওয়ায় সংগঠনপ্রধান অজিনক্যা শিন্ডে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন বলে জানিয়েছে দলটি। এ বিষয়ে অভিজিৎ দীপকের নির্দেশনা-সংবলিত একটি রেকর্ড করা ভিডিও প্রকাশ করেছে সিজেপি।
ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যেও আন্দোলন থেমে নেই। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভের পরিধি বাড়ছে বলে দাবি করছেন আয়োজকেরা। কর্ণাটক, কেরালা, মহারাষ্ট্র, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে হাজারো মানুষ দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।
গেল মাসের শেষ দিকে নির্বাচনে কারচুপি, ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দেওয়া এবং সাধারণ ভোটারদের অবৈধভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে সিজেপি। দলটির নেতৃত্বে তরুণদের একটি অংশ রাজপথে নামলে ধীরে ধীরে তাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন।
আন্দোলন ঘিরে সরকারের ব্যাপক ধরপাকড় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত দুই দিনে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করার দাবি করা হলেও এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিরোধীদের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে সরকার অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আন্দোলন তাৎক্ষণিকভাবে মোদি সরকারের পতন ঘটাবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে বিক্ষোভের বিস্তার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ বিজেপির জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে কি না, তা নির্ভর করবে আন্দোলনের স্থায়িত্ব, জনসমর্থন এবং বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ের ওপর।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: