ফ্রান্সে নজিরবিহীন সাইবার হামলা, একদিনেই ক্ষতি কয়েক কোটি ইউরো!
ফ্রান্সের শত শত সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হ্যাকারদের হামলায় কয়েকটি দোকানে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা বেড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে বিপুল পরিমাণ তাজা ও হিমায়িত খাবার নষ্ট হয়েছে। কয়েকটি দোকানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দেশটির শীর্ষস্থানীয় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইন্টারমার্শে, কো-অপারেটিভ ইউ, ই লেক্লের্কসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ নজিরবিহীন সাইবার হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, ইন্টারমার্শে ও এর সহযোগী ব্র্যান্ড নেটোর অন্তত ৩০০টি দোকান এবং কো-অপারেটিভ ইউর ১০০টির বেশি বিক্রয়কেন্দ্র এ হামলার শিকার হয়েছে। ক্যারেফোরের ৮০টি সুপারমার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, মনোপ্রির প্রায় ৪৯০টি দোকানের মধ্যে ৫ শতাংশ এ হামলার কবলে পড়েছে। ই লেক্লের্ক জানিয়েছে, তাদেরও কয়েকটি দোকান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় জানিয়েছে, ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি বড় খাদ্যপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট-সংযুক্ত ফ্রিজে এ বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনাটি তদন্তে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাকে (এএনএসএসআই) নির্দেশ দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশও এ হামলায় আক্রান্ত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে ফ্রান্স।
ইন্টারমার্শের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থিয়েরি কোটিয়ার্ড বিএফএম টেলিভিশনকে বলেন, এ নজিরবিহীন হামলায় দেশজুড়ে এক দিনেই কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হতে পারে।
বিএফএম টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যাকাররা দূর থেকে ফ্রিজের স্বয়ংক্রিয় বরফ গলানোর ব্যবস্থা চালু করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে দোকানগুলোর তাজা ও হিমায়িত খাবারের মজুত নষ্ট হয়ে যায়।
ইন্টারমার্শে জানিয়েছে, আক্রান্ত দোকানগুলোতে সংরক্ষিত তাজা ও হিমায়িত পণ্য ফেলে দিতে হবে।
কো-অপারেটিভ ইউর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দমিনিক শেলশের বলেন, রবিবার রাত থেকেই তাদের প্রতিষ্ঠানের হিমায়নব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, খাদ্য সংরক্ষণ ও মানুষের খাদ্য সরবরাহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত গুরুতর এবং নজিরবিহীন ঘটনা। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি জানান, দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা কাজ করছেন। একই সঙ্গে হামলার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা সাধারণত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব ব্যবস্থা ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দূর থেকেই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর এই সংযোগের নিরাপত্তাগত দুর্বলতা কাজে লাগিয়েই হ্যাকাররা হামলা চালিয়ে থাকতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান ড্যানফসের সরবরাহ করা সফটওয়্যারে একটি দুর্বলতা শনাক্ত করেছে এএনএসএসআই।
ড্যানফস জানিয়েছে, ফ্রান্সে তাদের হিমায়নব্যবস্থার সীমিতসংখ্যক ইউনিটে সমস্যার বিষয়টি তারা জানে। আক্রান্ত ইউনিটগুলোতে পুরোনো ফার্মওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা এবং পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলে ফেলার পরামর্শ তারা দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকদের দিয়ে আসছে।
এর আগে গত ৯ আগস্ট সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্ল্যারোটির প্রকাশিত এক গবেষণায় ড্যানফসের ব্যবস্থায় এমন কিছু দুর্বলতার কথা বলা হয়েছিল, যেগুলো কাজে লাগিয়ে নিরাপত্তা যাচাইয়ের ধাপ এড়িয়ে প্রবেশ করা সম্ভব হতে পারে।
ফ্রান্সের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন এফসিডি ড্যানফসের কাছে এ বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা দাবি করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, আক্রান্ত কিছু দোকানে ইতোমধ্যে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে।
সাইবার হুমকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সেকোইয়া থ্রেট ডিটেকশন অ্যান্ড রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফেলিক্স এইম রয়টার্সকে জানিয়েছেন, স্পেন, পর্তুগাল, পোল্যান্ড, জার্মানি ও বেলজিয়ামেও এ হামলার প্রভাব পড়েছে।
তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক স্টিভেন লাশাঁস আলজাজিরাকে বলেন, এ ধরনের হামলা একেবারে নজিরবিহীন নয়; তবে এত বড় পরিসরে এমন ঘটনা বিরল। ইন্টারনেট-সংযুক্ত কোনো যন্ত্রে নিরাপত্তাগত দুর্বলতা পাওয়া গেলে হামলাকারীরা দূর থেকেই তাতে প্রবেশ করে বিভিন্ন কার্যক্রম চালু করতে পারেন।
তার ভাষায়, ইন্টারনেটে যুক্ত অবকাঠামো এখন সাইবার হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ঘটনাকে তিনি বিশ্বজুড়ে সতর্ক হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেন। লাশাঁস বলেন, এ ধরনের হামলা ঠেকাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় এমন ঘটনা বারবার ঘটতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সুপারমার্কেটগুলোতে এবার খাবার নষ্ট করে কোটি কোটি ইউরোর ক্ষতি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে হামলাকারীরা আরও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো- যেমন জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বা হাসপাতাল- লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: