• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

১২ বছরের অপেক্ষার অবসান, যোগাযোগের নতুন দিগন্তে চীন ও উত্তর কোরিয়া

প্রকাশিত: ১১:৪১, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১১:৫০, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
১২ বছরের অপেক্ষার অবসান, যোগাযোগের নতুন দিগন্তে চীন ও উত্তর কোরিয়া

চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও জোরদার করতে চালু হয়েছে নতুন ইয়ালু নদী সেতু। প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদং থেকে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজু পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৪ সালে সেতুটি চালুর পরিকল্পনা থাকলেও নানা জটিলতায় তা আটকে ছিল প্রায় ১২ বছর। প্রতিবেশী দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতির মধ্যে সেতুটি চালু হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বেইজিং। নতুন সেতুটি চালুর ফলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সেতু চালু হলেও দুই দেশের বাণিজ্যে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের উল্লম্ফনের সম্ভাবনা কম। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা এবং চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার সতর্ক অবস্থান এর অন্যতম কারণ। নতুন ইয়ালু নদী সেতুটি কয়েক দশক পুরোনো চীন-কোরিয়া মৈত্রী সেতুর বিকল্প হিসেবে নির্মিত হয়েছে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী শাসনামলে পুরোনো সেতুটি নির্মাণ করা হয়।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বুধবার বলেন, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সেতুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এটি বাণিজ্য এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বিনিময় আরও সহজ করবে। গত বছর চীন ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭০ কোটি ডলারে। এর মধ্য দিয়ে মহামারির আগের পর্যায়ের বাণিজ্য আবারও ফিরে আসে। এই বাণিজ্যের বড় অংশই ছিল চীন থেকে উত্তর কোরিয়ায় পণ্য রপ্তানি।

দক্ষিণ কোরিয়ার হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং বিবিসিকে বলেন, উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর থাকায় সীমান্তপথে বাণিজ্য হঠাৎ করে ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

তিনি আরও বলেন, চীনা পণ্যের ব্যাপক প্রবেশে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনের প্রভাব বেড়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কা রয়েছে পিয়ংইয়ংয়ের। চীনও বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ধীরে ধীরে বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। চীন ও উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিনের মিত্র। দেশ দুটির মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চীনের নেই। তাদের সম্পর্ককে প্রায়ই ‘ঠোঁট ও দাঁতের মতো ঘনিষ্ঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়। চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুং প্রথম এই উপমা ব্যবহার করেছিলেন।

তবে এই মিত্রতার সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ২০১০-এর দশকের বেশির ভাগ সময় দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা দেখা দেয়। ২০১৭ সালে কিম জং উনের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এরপর দেশটি নিষিদ্ধ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও বাড়িয়ে দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বৃদ্ধি পায় এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে দেশটির সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে চীনের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বিবিসিকে বলেন, এক দশক আগেও চীন উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রকাশ্য সমালোচনা করত এবং দেশটির পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানাত। কিন্তু এখন এ বিষয়ে চীন খুব কমই কথা বলে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি চীনের অবস্থান পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হতে পারে।

ধারণা করা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার অন্তত ২ হাজার ৩০০ সেনা নিহত হয়েছেন। এর বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে তেল সরবরাহ করছে, যা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিষয়। ২০২৪ সালে পিয়ংইয়ংয়ের অস্ত্র ও সেনা সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়া এক বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল পাঠিয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল।

গত মাসে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া তাদের প্রথম সড়ক সেতু চালু করে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০টি যানবাহন এবং ২ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করতে পারবেন। এমন পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার ওপর নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে বেইজিং দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

মহামারির কারণে ছয় বছর বন্ধ থাকার পর গত মার্চে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু করে এয়ার চায়না। একই মাসে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও পুনরায় শুরু হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত জুনে উত্তর কোরিয়া সফর করেন। চলতি বছরের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি দেশটির নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অবস্থিত ইহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলির মতে, নতুন ইয়ালু নদী সেতু চালু হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে শি জিনপিংয়ের জুনের উত্তর কোরিয়া সফর যে কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে সেতু চালু করতে দীর্ঘ বিলম্ব, মহামারির সময় উত্তর কোরিয়ার স্বেচ্ছা বিচ্ছিন্নতা এবং দেশটির অভ্যন্তরে আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো দেখিয়ে দেয়, বেইজিংয়ের জন্য পিয়ংইয়ং এখনো একটি কঠিন অংশীদার।

সূত্র: বিবিসি

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত