ম্যাখোঁর কঠিন সিদ্ধান্তে আরও তীব্র হচ্ছে ফ্রান্সের বিক্ষোভ
ফ্রান্সে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। বেতন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শিক্ষার্থীদের গণ্ডি ছাড়িয়ে শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আলোচনা শুরু করলেও আন্দোলনকারীরা তাতে সন্তুষ্ট নন। বরং আগামী শনিবার আবারও বিক্ষোভ এবং ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত আর্থিক সামর্থ্য ও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এতে গত ১৭ অক্টোবর বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি শ্রমিক নেতারাও আগামী শনিবার, ৩১ অক্টোবর, আবারও রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন তারা। গত মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন শ্রমিক নেতারা।
বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের সহ-নেত্রী মুরিয়েল গিলবার্ট বিএফএম টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন অসন্তোষের সম্মিলন দেখতে পাচ্ছি।’ শিক্ষার্থী, শ্রমিক, দমকলকর্মীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্ষোভ এক জায়গায় এসে মিলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আগামী শনিবার সবাইকে রাজপথে নামার আহ্বানও জানান গিলবার্ট।
শিক্ষকদের সংগঠন এসইউডি এডুকেশন জানিয়েছে, তারা ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নেবে। অন্যদিকে বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি চলতি সপ্তাহে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে।
২০১৮ সালে জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনও আগামী শনিবার বড় ধরনের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন শহরের পৌরসভা কার্যালয় ও জাতীয় সংসদের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছেন।
আন্দোলনকর্মী আজেলমা সিগো বলেন, ‘দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, সড়কের মোড়, আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি এবং কর্মক্ষেত্রে এই ক্ষোভ বাড়ছে।’
২০১৯ সালে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের মুখে জ্বালানির ব্যয় কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ম্যাখোঁ। তবে সাত বছর পর এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সরকারি অর্থব্যবস্থায় চাপ থাকায় বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার সরকারের আর্থিক সুযোগ সীমিত।
এ ছাড়া আগামী এপ্রিলে ম্যাখোঁর মেয়াদ শেষ হবে। তার মধ্যপন্থী দলও এখন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ফলে বড় ধরনের আইন পাস করানো কিংবা ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তন আনা সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তবে আন্দোলনকারীদের নেতারা বলছেন, সরকার এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে, তা তাদের দাবি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
গিলবার্ট বলেন, ‘এই সরকারের কাছ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সাড়াই পাইনি।’
এদিকে পুলিশ ইউনিয়নগুলো জানিয়েছে, শনিবারের মতো বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে দীর্ঘ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শনিবার প্যারিস ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হলেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়ানো গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভ থেকে ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এদিন প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আগের সপ্তাহে আহত পুলিশের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি।
ফ্রান্সের বাইরেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। শনিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। অন্যদিকে আলবেনিয়ায় মে মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলতি মাসে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ইতালির কয়েকটি শহরেও টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো সংঘর্ষ ও উত্তেজনা দেখা গেছে।
সূত্র: রয়টার্স
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: