অবশেষে পরাজয় মেনে নিলেন বলসোনারো
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর ফল বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। তবে তার রাজনৈতিক দল লিবারেল পার্টি নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। যদিও নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা দাবি করেছেন দলটির নেতা ভালদেমার কস্তা নেতো। এদিকে, নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিতে এখনো স্পষ্ট ঘোষণা দেননি ফ্লাভিও বলসোনারো।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে কস্তা নেতো বলেন, তাদের দল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল স্বীকার করছে। তবে নির্বাচনের বিষয়ে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
রবিবারের নির্বাচনে বামপন্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে ৪৪ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন ফ্লাভিও বলসোনারো। পরাজয়ের পর দেওয়া বক্তব্যে তিনি নির্বাচনের ফলকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন। ভোট গ্রহণের সময় শেষ মুহূর্তে বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে এর কারণ হিসেবে তুলে ধরে ফল বাতিলের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
সমর্থকদের উদ্দেশে বলসোনারো বলেন, ‘আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব। আমি এই নির্বাচন বাতিলের আবেদন জানাব।’
রবিবারের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছিল দুই প্রার্থীর প্রচারশিবিরই। তবে তাদের কারণ ছিল ভিন্ন।
বলসোনারোর পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কিছু ভোটারের পক্ষে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ ব্রাজিলের কয়েকটি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়। অঞ্চলটিকে সাধারণত ডানপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে, লুলার প্রচারশিবির অভিযোগ করে, নির্বাচনের দিন কয়েকটি শহরে গণপরিবহন সীমিত করা হয়েছিল। এতে শ্রমজীবী মানুষের ভোট দেওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে দাবি করে তারা।
এ ঘটনায় সালভাদর শহরের পরিবহন কর্মকর্তা পাবলো সুজাকে রবিবার গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
দুই পক্ষের আবেদনের পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিন ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর অনুমতি দেন। ব্রাসিলিয়া সময় বিকেল ৫টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও যেসব কেন্দ্র তখনো বন্ধ হয়নি, সেগুলো রাত ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলসোনারো দাবি করেন, এতে তার সমর্থকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, লুলার সঙ্গে জানিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে লুলা তাঁকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। এর আগে জানিন লুলার ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসেবেও কাজ করেছেন।
বলসোনারো বলেন, ‘সাবেক এক সহযোগীর অনুরোধে কলমের এক আঁচড়ে জানিন খেলার মাঝপথে নিয়ম বদলে দিয়েছেন।’
তবে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রাজিলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইনস্পারের অধ্যাপক পেদ্রো বুর্গোসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোটের সময় বাড়ানোর ফলে সারা দেশে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার ভোট পড়েছে, যা মোট ভোটের ০.০৩ শতাংশেরও কম। লুলার সঙ্গে বলসোনারোর ভোটের ব্যবধানের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম।
লুলা ৬ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে, বলসোনারোর ভোটের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজারের বেশি।
নির্বাচনের ফল নিয়ে বলসোনারোর অভিযোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন তার কয়েকজন ডানপন্থী মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, নির্বাচনটি ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মনে হয়েছে তার কাছে। তার ভাষায়, নির্বাচন নিয়ে এমন পরিস্থিতি ‘খুব খারাপ’ দেখাচ্ছে।
তবে বলসোনারোর পক্ষে সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত দেননি ট্রাম্প। বরং তিনি বলেন, নির্বাচনে তিনি কোনো পক্ষ নেননি।
নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে বলসোনারোর অনীহা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মেনে নেবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে তার বাবা জইর বলসোনারোর ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন।
জইর বলসোনারো ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর তিনি ফল স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তিনি ও তার মিত্ররা আইনি চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন পদক্ষেপে নির্বাচনের ফল পাল্টানোর চেষ্টা করেন। ক্ষমতা হস্তান্তর ঠেকাতে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
বর্তমানে অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন জইর বলসোনারো। এ ছাড়া নির্বাচনের বিষয়ে ভুল তথ্য ছড়াতে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাকে আট বছরের জন্য সরকারি পদে দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
ফ্লাভিও ও তার ভাইবোনেরা বাবাকে মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। তাদের পরিবার জইর বলসোনারোর বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা বলে দাবি করেছে।
তবে রবিবারের নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবিতে ফ্লাভিও শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ফোলহা দে সাও পাওলো সোমবার জানিয়েছে, লুলার বড় ব্যবধানে জয় এবং সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষের ফল অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফ্লাভিওর আইনজীবী ও রাজনৈতিক মিত্ররা তাকে ফল বাতিলের চেষ্টা থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে, নির্বাচনে পরাজয়ের পর দেশ ছাড়তে পারেন—এমন জল্পনার মধ্যে ফেডারেল পুলিশ তাকে পাসপোর্ট জমা দিতে বলেছে বলে জানিয়েছেন ফ্লাভিও। তিনি বলেন, নির্দেশটি মেনে নেবেন এবং দেশ ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা তার নেই।
ফ্লাভিও বলেন, ‘এই বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করতে আমি বিরোধী দলকে সংগঠিত করব।’
সূত্র: আলজাজিরা
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: