সব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ফ্রান্সে স্কুল অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
ফ্রান্সে স্কুল অবরোধ ও রাজপথের বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন। শিক্ষা খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার নতুন কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করলেও আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের সব দাবি পূরণ হয়নি। তাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে চান তারা।
সোমবার ফ্রান্স ইনফো টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘লে লিসেয়াঁ’ নামের শিক্ষার্থী সংগঠনের নেতা পিয়ের সৌরজা বলেন, সরকার এখন আলোচনার টেবিলে এসেছে। ফলে দাবি আদায়ের জন্য দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সর্বোচ্চসংখ্যক দাবি পূরণ নিশ্চিত করতে আন্দোলন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন ক্ষমতার লড়াইয়ে রয়েছি। আমাদের সর্বোচ্চসংখ্যক দাবি পূরণ করতে হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাতে হবে।’
সরকারের পক্ষ থেকে কিছু শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনপ্রক্রিয়া পর্যালোচনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে সৌরজার ভাষ্য, তারা শুধু আংশিক পদক্ষেপ চান না, কার্যকর ব্যবস্থা চান।
গত সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে অবরোধ শুরু হয়। পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলন কয়েক বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় তরুণদের প্রতিবাদ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। পরে এতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরাও যোগ দেন। শনিবারগুলোতে নিয়মিত বড় আকারের বিক্ষোভ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর সংকট দূর করা এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন মেরামত। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাদ ধসে পড়ার ঝুঁকি, দেয়ালে ছত্রাক, নষ্ট শৌচাগার, পর্যাপ্ত চেয়ার না থাকা এবং জানালা ঠিকমতো বন্ধ না হওয়ার মতো সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন তারা।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে স্বীকার করেছেন, কিছু স্কুলের অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেখানে পাঠদান চালানোর উপযুক্ত পরিবেশ নেই। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কারকাজ শুরু করতে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষকে চার বিলিয়ন ইউরো ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী জানান, উচ্চবিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৮ জনে সীমিত রাখা হবে। প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে কম আয়ের এলাকার ৫০ শতাংশ স্কুলে এ ব্যবস্থা চালু হবে। আগামী বছর থেকে তা সব উচ্চবিদ্যালয়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং ফরাসি ব্যাকালরিয়া পরীক্ষা পদ্ধতি পর্যালোচনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনপ্রক্রিয়া পরিচালনাকারী ‘পারকুরসুপ’ ব্যবস্থাকে অস্বচ্ছ ও অন্যায্য বলে সমালোচনা করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে এবং ২০২৮ সালে এর পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হবে। এ বিষয়ে বুধবার পার্লামেন্টে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ ব্যাপতিস্ত জানান, উচ্চশিক্ষায় আরও ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আসন তৈরি করা হবে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সংগঠন ‘লে লিসেয়াঁ’র প্রতিনিধি লুই লেতুবলোঁ আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভে অংশ নেওয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন। আমরা কিছু অর্জন করেছি। সরকার ভয় পেয়েছে এবং বুঝতে পেরেছে, তাদের কিছু করতে হবে এবং আমাদের কথা শুনতে হবে। তবে আমাদের সব দাবি পূরণ হয়নি। যত দিন প্রয়োজন, আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ ব্যাপতিস্ত বলেছেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও আলোচনার জন্য সরকারের দরজা খোলা রয়েছে।
আন্দোলন চলাকালে পুলিশের বিস্ফোরকজাতীয় অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে কয়েকজন শিশু গুরুতর আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া শত শত শিশুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই দিন বিভিন্ন স্থানে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে, কোথাও কোথাও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভের জন্য শহরের কেন্দ্রের পরিবর্তে বাইরের দিকে মিছিলের পথ নির্ধারণ করা হয়। ফলে সেদিনের কর্মসূচি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, সপ্তাহান্তে নিস ও মন্টপেলিয়েরের মতো শহরে নতুন একটি প্রবণতা দেখা গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো সংগঠিতভাবে সেখানে এসে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। এ ঘটনায় ১১ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার কথা রয়েছে।
সোমবার মার্সেই সফরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, দেশজুড়ে রাজপথের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভের দিনটিও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ম্যাখোঁ বলেন, ১৭ অক্টোবরের মতো লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা আর কখনোই ঘটতে দেওয়া উচিত নয়। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আর মাত্র ছয় মাস দূরে থাকা অবস্থায় দেশে এমন অস্থিরতা থাকা স্বাভাবিক নয়।
আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়ার কথা রয়েছে ম্যাখোঁর। অন্যদিকে, জনমত জরিপগুলোতে উগ্র ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেন এগিয়ে রয়েছেন।
ম্যাখোঁ বলেন, ‘আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখব। আমরা সবাই নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারলে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসবে—কারণ আমরা মানুষের ন্যায্য প্রত্যাশাগুলো পূরণের উদ্যোগ নেব এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখব। তবে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।’
এদিকে, ১৭ অক্টোবরের সংঘর্ষের আগে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতায় ব্যর্থতা ছিল বলে স্বীকার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: