• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর ভয়াবহ তথ্য দিলো জাতিসংঘ

প্রকাশিত: ১৯:৪৫, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৯:৪৮, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর ভয়াবহ তথ্য দিলো জাতিসংঘ

বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিককে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের জন্য পাচার করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরে তাদের অনেককে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এতে কেউ নিহত, আহত, বন্দী কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থাপনের জন্য তৈরি এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা পর্যালোচনা করে। এর মধ্যে ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তানসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ।

বেসামরিক চাকরির প্রলোভন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতারণা ও জবরদস্তির শিকার ব্যক্তিরা সবাই পুরুষ। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। অধিকাংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষ। তাদের আর্থিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ায় আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হতো।

বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিশন রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করেছে। এসব ভিসার জন্য রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। নথিপত্রে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক হিসেবে উল্লেখ থাকলেও কমিশনের সামগ্রিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যবস্থার আড়ালে বিদেশি নাগরিকদের রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী এজেন্ট ও সংস্থাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে রাশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিত। নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, কারখানার শ্রমিক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় কাজের প্রস্তাব দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাশিয়ার নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।

নিয়োগকারী এজেন্টরা নিজেদের বৈধ বা সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিত। চাকরির প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ও অন্যান্য নথি দেখানো হতো। এরপর ভিসা, উড়োজাহাজের টিকিট ও ভ্রমণের অন্যান্য ব্যবস্থা করে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এজেন্টরা নিজেরাও নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে রাশিয়ায় যেত।

রাশিয়ায় পৌঁছে সামরিক চুক্তিতে সই
তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক বিদেশি নাগরিককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অনেকেই এর শর্ত বুঝতে পারেননি। কোনো কোনো ব্যক্তির পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করা হয়।

একপর্যায়ে তারা জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত বেসামরিক চাকরির পরিবর্তে তাদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করতে হবে।

প্রতিবেদনে এক ভুক্তভোগীর স্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি জানান, তার স্বামীর পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এরপর তাকে চুক্তির বিভিন্ন জায়গায় সই করতে বলা হয়। চুক্তিটি শুধু রুশ ভাষায় লেখা ছিল। ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্বামী প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়েছিলেন এবং তার সামনে কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না।

কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ বাহিনীতে নিয়োগের পর বিদেশি নাগরিকদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয় এবং বিপজ্জনক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের অনেকে নিহত, আহত, বন্দী কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের পরিবারেও দুর্ভোগ
চাকরির আশায় বিদেশে গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোও দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেউ কেউ নিয়োগ ফি হিসেবে বিপুল অর্থ দিয়েছেন। আবার অনেক পরিবার ঋণ করেছে কিংবা সম্পদ বিক্রি করে স্বজনদের বিদেশে পাঠিয়েছে।

পরে স্বজনের মৃত্যুসংবাদ পেলেও কোনো কোনো পরিবার তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও অনেক পরিবার নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়নি।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নিয়োগকারী এজেন্টরা অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পরিবারের ফোনও ধরত না। ফলে স্বজনের অবস্থান জানতে কিংবা তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে গিয়ে পরিবারগুলো আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

মানবপাচারের প্রমাণ, ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান
তদন্ত কমিশন বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী চক্রের সঙ্গে রুশ কর্তৃপক্ষের উচ্চমাত্রার সমন্বয়ের প্রমাণ পেয়েছে। কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রতারণা, আর্থিক ও সামাজিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া এবং জোর করে সামরিক চুক্তিতে সই করানোর মতো কর্মকাণ্ড বিদেশি নাগরিকদের পাচার করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ করা, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে রুশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।

পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে ভুক্তভোগীদের মুক্ত করতে রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতারণামূলক নিয়োগ ঠেকাতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

আগেই সতর্ক করেছিল ব্র্যাক
রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানোর ঘটনা এর আগেও সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।

ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভালো বেতনের চাকরির আশায় বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়ার পর বাংলাদেশিদের জোর করে সামরিক চুক্তিতে সই করিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ, ভুক্তভোগীদের উদ্ধার এবং সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল ব্র্যাক।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে গত তিন বছরে এই যুদ্ধে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্দশা, ঋণের বোঝা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারার বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।

জাতিসংঘের এই অনুসন্ধান বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা করে মানুষকে সশস্ত্র সংঘাতে যুক্ত করার আন্তর্জাতিক চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা, নিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং নিখোঁজ বা আটকে পড়া ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করতে আরও তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে।

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত